ওরে মন, বলি, শুন তত্ত্ব-বিবরণ।
ওরে মন, বলি, শুন তত্ত্ব-বিবরণ।
যাঁহার বিস্মৃতি-জন্য জীবের বন্ধন ॥১॥
তত্ত্ব এক অদ্বিতীয় অতুল্য অপার।
সেই তত্ত্ব পরব্রহ্ম সর্বসারৎসার ॥২॥
সেই তত্ত্ব শক্তিমান্ সম্পূর্ণ সুন্দর।
শক্তি, শক্তিমান্ - এক বস্তু নিরন্তর ॥৩॥
নিত্যশক্তি নিত্যসর্ব – বিলাস – পোষক।
বিলাসার্থ
বৃন্দাবন, বৈকুন্ঠ, গোলোক ॥৪॥
বিলাসার্থ নাম-ধাম-গুণ-পরিকর।
দেশ-কাল-পাত্র সব শক্তি অনুচর ॥৫॥
শক্তির প্রভাব আর প্রভুর বিলাস।
পরব্রহ্ম সহ নিত্য একাত্ম-প্রকাশ ॥৬॥
অতএব ব্রহ্ম আগে, শক্তি-কার্য পরে।
যে করে’ সিদ্ধান্ত, সেই মূর্খ এ সংসারে ॥৭॥
পূর্ণচন্দ্র বলিলে কিরণ-সহ জানি।
অকিরণ চন্দ্রসত্ত্বা কভু নাহি মানি ॥৮॥
ব্রহ্ম আর ব্রহ্মশক্তি সহ পরিকর।
সমকাল নিত্য বলি’ মানি অতঃপর ॥৯॥
অখণ্ড বিলাসময় পরব্রহ্ম যেই।
অপ্রাকৃত বৃন্দাবনে কৃষ্ণচন্দ্র সেই ॥১০॥
সেই সে অদ্বয়তত্ত্ব পরানন্দাকার।
কৃপায় প্রকট হৈল ভারতে আমার ॥১১॥
কৃষ্ণ সে পরমতত্ত্ব প্রকৃতির পর।
ব্রজেতে বিলাস কৃষ্ণ করে’ নিরন্তর ॥১২॥
চিদ্ধাম-ভাস্কর কৃষ্ণ, তাঁ’র জ্যোতির্গত।
অনন্ত চিৎকণ জীব তিষ্ঠে অবিরত ॥১৩॥
সেই জীব প্রেমধর্মী, কৃষ্ণগত প্রাণ।
সদা কৃষ্ণাকৃষ্ট, ভক্তিসুধা করে’ পান ॥১৪॥
নানাভাবমিশ্রিত পিয়া দাস্য-রস।
কৃষ্ণের অনন্তগুণে সদা থাকে বশ ॥১৫॥
কৃষ্ণ মাতা, কৃষ্ণ পিতা, কৃষ্ণ সখা, পতি।
এই সব ভিন্নভাবে কৃষ্ণে করে’ রতি ॥১৬॥
কৃষ্ণ সে পুরুষ এক নিত্য বৃন্দাবনে।
জীবগণ নারীবৃন্দ, রমে কৃষ্ণসনে ॥১৭॥
সেই ত’ আনন্দ-লীলা যা’র নাই অন্ত।
অতএব কৃষ্ণলীলা অখণ্ড অনন্ত ॥১৮॥
যে-সব জীবের
ভোগ-বাঞ্ছা উপজিল।
পুরুষ ভাবেতে তা’রা জড়ে প্রবেশিল ॥১৯॥
মায়া-কার্য জড়, মায়া – নিত্যশক্তি-ছায়া।
কৃষ্ণদাসী সেহ সত্য, কারা-কর্ত্রী মায়া ॥২০॥
সেই মায়া আদর্শের সমস্ত বিশেষ।
লইয়া গঠিল বিশ্ব যাহে পূর্ণ ক্লেশ ॥২১॥
জীব যদি হইলেন কৃষ্ণ-বহির্মুখ।
মায়াদেবী তবে তা’রে যাচিলেন সুখ ॥২২॥
মায়া সুখে মত্ত জীব শ্রীকৃষ্ণ ভুলিল।
সেই সে অবিদ্যা-বশে অস্মিতা জন্মিল ॥২৩॥
অস্মিতা হইতে হৈল মায়াভিনিবেশ।
তাহা হইতে জড়গত রাগ আর দ্বেষ ॥২৪॥
এইরূপে জীব কর্মচক্রে প্রবেশিয়া।
উচ্চাবচ-গতিক্রমে ফিরেন ভ্রমিয়া ॥২৫॥
কোথা সে বৈকুণ্ঠানন্দ, শ্রীকৃষ্ণ বিলাস !
কোথা মায়াগত সুখ,
দুঃখ সর্বনাশ! ২৬ ॥
চিত্তত্ব
হইয়া জীবের মায়াভিরমণ ।
অতি তুচ্ছ জুগুল্পিত অনন্ত
পতন ॥ ২৭ ॥
মায়িক দেহের ভাবাভাবে দাস্য করি ।
পরতত্ত্ব জীবের কি কষ্ট আহা মরি! ২৮ ॥
ভ্রমিতে ভ্রমিতে যদি সাধুসঙ্গ হয় ।
পুনরায় গুপ্ত নিত্যধর্মের উদয় ॥ ২৯ ॥
সাধুসঙ্গে কৃষ্ণকথা হয় আলােচন ।
পূর্বভাব উদি’ কাটে মায়ার
বন্ধন ॥ ৩০ ॥
কৃষ্ণ-প্রতি জীব যবে করেন ঈক্ষণ ।
বিদ্যা-রূপা মায়া করে
বন্ধন ছেদন ॥ ৩১ ॥
মায়িক জগতে বিদ্যা নিত্যবৃন্দাবন ।
জীবের সাধন-জন্য করে’
বিভাবন ॥ ৩২ ॥
সেই বৃন্দাবনে জীব ভাবাবিষ্ট হয়ে ।
নিত্য সেবা লাভ করে’
চৈতন্য-আশ্রয়ে ॥ ৩৩ ॥
প্রকটিত লীলা, আর গােলােক-বিলাস ।
এক তত্ত্ব,
ভিন্ন নয়, দ্বিবিধ
প্রকাশ ৷৷ ৩৪ ।।
নিত্যলীলা নিত্যদাসগণের নিলয় ।
এ প্রকট-লীলা বদ্ধজীবের
আশ্রয় ॥ ৩৫ ॥
অতএব বৃন্দাবন জীবের আবাস ।
অসার সংসারে নিত্য-তত্ত্বের
প্রকাশ ॥ ৩৬ ॥
বৃন্দাবন-লীলা জীব করহ আশ্রয় ।
আত্মগত-রতি-তত্ত্ব যাহে
নিত্য হয় ॥ ৩৭ ॥
জড়রতি-খদ্যোতের
আলােক অধম ।
আত্মরতি-সূর্যোদয়ে হয়
উপশম ॥ ৩৮ ॥
জড়রতিগত যত শুভাশুভ কর্ম ।
জীবের সম্বন্ধে সব ঔপাধিক
ধর্ম ॥ ৩৯ ৷৷
জড়তি হৈতে লােক-ভােগ অবিরত।
জড়তি ঐশ্বর্যের সদা অনুগত ॥ ৪০ ॥
জড়রতি,
জড়দেহ প্রভুসম ভায় ।
মায়িক বিষয়-সুখে জীবকে
নাচায় ॥ ৪১ ॥
কভু তারে লয়ে যায় ব্রহ্মলোেক যথা ।
কভু তারে শিক্ষা দেয়
যােগৈশ্বর্য-কথা ॥ ৪২ ॥
যােগৈশ্বর্য, ভােগৈশ্বর্য-সকলি
সভয় ।
বৃন্দাবনে আত্মরতি জীবের
অভয় ॥ ৪৩ ॥
শ্রীকৃষ্ণ-বিমুখ জন ঐশ্বর্যের আশে ।
মায়িক জড়ীয় সুখে বদ্ধ
মায়া-পাশে ॥ ৪৪ ।
অকিঞ্চন আত্মরত কৃষ্ণরতিসার ।
জানি’ ভুক্তি-মুক্তি-আশা করে’ পরিহার ॥ ৪৫ ॥
সংসারে জীবন-যাত্রা অনায়াসে করি।
নিত্য দেহে নিত্য সেবে আত্মপ্রদ হরি ॥ ৪৬ ॥
বর্ণমদ,
বলমদ, রূপমদ, যত ।
বিসর্জন দিয়া ভক্তিপথে হন রত ॥ ৪৭ ॥
আশ্ৰমাদি বিধানেতে রাগদ্বেষহীন ।
একমাত্র কৃষ্ণভক্তি জানি’ সমীচীন ॥ ৪৮ ॥
সাধুগণ-সঙ্গে
সদা হরিলীলারসে ।
যাপন করেন কাল নিত্যধর্মবশে ॥ ৪৯ ॥
জীবনযাত্রার
জন্য বৈদিক-বিধান।
রাগ-দ্বেষ বিসর্জিয়া করেন
সম্মান॥৫০॥
সামান্য
বৈদিকধর্ম অর্থফলপ্রদ।
অর্থ হৈতে কাম-লাভ মূঢ়ের
সম্পদ॥৫১॥
সেই
ধর্ম, সেই
অর্থ সেই কাম যত।
স্বীকার করেন দিন-যাপনের মত॥৫২॥
তাহাতে
জীবনযাত্রা করেন নির্বাহ।
জীবনের অর্থ—কৃষ্ণভক্তির
প্রবাহ॥৫৩॥
অতএব
লিঙ্গহীন সদা সাধুজন।
দ্বন্দ্বাতীত হ’য়ে করেন শ্রীকৃষ্ণ-ভজন॥৫৪॥
জ্ঞানের
প্রয়াসে কাল না করি’ যাপন।
ভক্তিবলে নিত্যজ্ঞান করেন
সাধন॥৫৫॥
যথা-তথা
বাস করি’, যে-সে
বস্ত্র পরি’।
সুলব্ধ-ভোজনদ্বারা দেহ
রক্ষা করি’॥৫৬॥
কৃষ্ণভক্ত
কৃষ্ণসেবা-আনন্দে মাতিয়া।
সদা কৃষ্ণপ্রেমরসে ফিরেন
গাহিয়া॥৫৭॥
নবদ্বীপে
শ্রীচৈতন্য-প্রভু অবতার।
ভকতিবিনোদ গায় কৃপায়
তাহার॥৫৮॥

কোন মন্তব্য নেই