পদ্যানুবাদ চন্দ্র-সূর্যরূপী চৈতন্য-নিত্যানন্দ
পদ্যানুবাদ
চন্দ্র-সূর্যরূপী চৈতন্য-নিত্যানন্দ
চৈঃ
চঃ আদি ১.২
ও ১.৮৪
বন্দে
শ্রীকৃষ্ণচৈতন্যনিত্যানন্দৌ
সহোদিতৌ ।
গৌড়োদয়ে
পুষ্পবন্তৌ চিত্রৌ শন্দৌ তমোনুদৌ ॥
গৌড়দেশের
পূর্ব দিগন্তে একই সময়ে অতি
বিস্ময়করভাবে সূর্য ও চন্দ্রের মতো
যাঁরা উদিত হয়েছেন, সেই
পরম মঙ্গলপ্রদাতা এবং অজ্ঞান ও
অন্ধকারনাশক শ্রীকৃষ্ণচৈতন্য মহাপ্রভু ও শ্রীনিত্যানন্দ প্রভুকে
আমি বন্দনা করি ।
চৈঃ
চঃ আদি ১.৮৮-৮৯
সূর্যচন্দ্র
হরে যৈছে সব অন্ধকার
।
বস্তু প্রকাশিয়া করে ধর্মের প্রচার
৷
এই মত দুই ভাই
জীবের অজ্ঞান-।
তমোনাশ করি' কৈল তত্ত্ববস্তু-দান ৷৷
সূর্য
ও চন্দ্র যেমন অন্ধকার বিদূরিত
করে সব কিছুর যথার্থ
রূপ প্রকাশ করে, তেমনই এই
দুই ভাই জীবের অজ্ঞানতারূপী
অন্ধকার দূর করে তাদের
পরম তত্ত্বজ্ঞানের আলোক দান করেছেন
।
সর্বোত্তম
বিষয় – সর্বোত্তম ফল
মূল
শ্লোক
চৈঃ
চঃ অন্ত্য ৫.৪৮
বিক্রীড়িতং
ব্রজবধূভিরিদঞ্চ বিষ্ণোঃ
শ্রদ্ধান্বিতোহনুশৃণুয়াদথ বর্ণয়েদ্ যঃ ।
ভক্তিং পরাং ভগবতি প্রতিলভ্য
কামং
হৃদ্রোগমাশ্বপহিনোত্যচিরেণ ধীরঃ ৷৷
‘যিনি
অপ্রাকৃত শ্রদ্ধান্বিত হয়ে এই রাস
পঞ্চাধ্যায়ে ব্রজবধূদের সঙ্গে শ্রীকৃষ্ণের অপ্রাকৃত ক্রীড়া বর্ণনা শ্রবণ করেন বা বর্ণন
করেন, সেই ধীর পুরুষ
ভগবানে যথেষ্ট পরাভক্তি লাভ করে হৃদ্রোগ
রূপ জড় কামকে শীঘ্রই
দূর করেন। -প্রদ্যুম্ন মিশ্রের প্রতি মহাপ্রভু
পদ্যানুবাদ
চৈঃ
চঃ অন্ত্য ৫.৪৫-৪৭
ব্রজবধূ-সঙ্গে কৃষ্ণের রাসাদি-বিলাস।
যেই জন কহে,
শুনে করিয়া বিশ্বাস ৷৷
হৃদরোগ-কাম তাঁর তৎকালে
হয় ক্ষয়।
তিনগুণ-ক্ষোভ নহে, ‘মহাধীর’ হয় ৷
উজ্জ্বল মধুর প্রেমভক্তি সেই
পায় ৷
আনন্দে
কৃষ্ণমাধুর্যে বিহরে সদায় ৷৷
কেউ
যখন সুদৃঢ় বিশ্বাস সহকারে ব্রজবধূদের সঙ্গে শ্রীকৃষ্ণের রাস লীলা-বিলাস
শ্রবণ করেন এবং কীর্তন
করেন, তৎক্ষণাৎ তার কামরূপ হৃদরোগ
নিরাময় হয়, এবং প্রকৃতির
তিনটি গুণের প্রভাব থেকে মুক্ত হয়ে
তিনি ‘মহাধীর’ হন । উজ্জ্বল,
মধুর প্রেমভক্তি যিনি আস্বাদন করেন,
তিনি নিরন্তর পরম আনন্দে কৃষ্ণ
মাধুর্যে বিহার করেন ।
ভক্ত-হৃদয়ে ভগবানের বাস
মূল
শ্লোক চৈঃ চঃ আদি
১.৬
সাধবো
হৃদয়ং মহ্যং সাধুনাং হৃদয়ত্ত্বহুম্ ।
মদন্যত্তে ন জানন্তি নাহং
তেভ্যো মনাগপি ৷৷
সাধু-মহাত্মারা আমার হৃদয় এবং
আমিও তাঁদের হৃদয় । তাঁরা আমাকে ছাড়া
অন্য কাউকে জানেন না এবং আমিও
তাঁদের ছাড়া অন্য কাউকে আমার
বলে জানি না ।
(শ্রীঃভাঃ ৯.৪.৬৮)
পদ্যানুবাদ
চৈঃ
চঃ আদি ১.৬১
ঈশ্বরস্বরূপ
ভক্ত তাঁর অধিষ্ঠান ।
ভক্তের হৃদয়ে কৃষ্ণের সতত বিশ্রাম ৷৷
যে শুদ্ধ ভক্ত নিরন্তর ভগবানের
প্রেমময়ী সেবায় যুক্ত, তিনি ভগবানেরই স্বরূপ
এবং সেই ভক্তের হৃদয়ে
ভগবান সর্বদাই বিরাজ করেন ।
পরম
সত্যের ত্রিবিধ প্রতীতি
মূল
শ্লোক
চৈঃ
চঃ আদি ১.৩
যদদ্বৈতং
ব্রহ্মোপনিষদি তদপ্যস্য তনুভা
য আত্মান্তর্যামী পুরুষ ইতি সোঽস্যাংশবিভবঃ।
ষড়ৈশ্বর্যৈঃ পূর্ণো য ইহ ভগবান্
স স্বয়ময়ং
ন চৈতন্যাৎ কৃষ্ণাজ্জগতি পরতত্ত্বং পরমিহ ৷৷ ৩ ৷৷
উপনিষদে
যাঁকে নির্বিশেষ ব্রহ্মরূপে বর্ণনা করা হয়েছে, তা
তাঁর (এই শ্রীকৃষ্ণচৈতন্যের) অঙ্গকান্তি ।
যোগশাস্ত্রে যোগীরা যে পুরুষকে অন্তর্যামী
পরমাত্মা বলেন, তিনিও তাঁরই (এই শ্রীকৃষ্ণচৈতন্যের) অংশ-বৈভব ।
তত্ত্ববিচারে যাঁকে ষড়ৈশ্বর্যপূর্ণ ভগবান বলা হয়, তিনিও
স্বয়ং এই শ্রীকৃষ্ণচৈতন্যেরই অভিন্ন স্বরূপ।
এই জগতে শ্রীকৃষ্ণচৈতন্য থেকে
ভিন্ন পরতত্ত্ব আর কিছু নেই
।
পদ্যানুবাদ
চৈঃ
চঃ আদি ২.১২
তাঁহার
অঙ্গের শুদ্ধ কিরণ-মণ্ডল।
উপনিষৎ কহে তাঁরে ব্রহ্ম
সুনির্মল ৷
উপনিষদে
যাকে নির্বিশেষ ব্রহ্মরূপে অভিহিত করা হয়েছে, তা
হচ্ছে সেই পরম পুরুষের
অঙ্গপ্রভা ।
চৈঃ
চঃ আদি ২.১৮
আত্মান্তর্যামী
যাঁরে যোগশাস্ত্রে কয় ।
সেহ গোবিন্দের অংশ
বিভূতি যে হয় ৷
যোগশাস্ত্রে
যাঁকে আত্মান্তর্যামী বা পরমাত্মা বলে
বর্ণনা করা হয়েছে, তিনি
হচ্ছেন গোবিন্দের অংশ-বিভূতি ।
চৈঃ
চঃ আদি ২.২5-53
সেইত'
গোবিন্দ সাক্ষাচৈতন্য গোসাঞি ।
জীব
নিস্তারিতে ঐছে দয়ালু আর
নাই ৷
পরব্যোমেতে
বৈসে নারায়ণ নাম ।
ষড়ৈশ্বর্যপূর্ণ
লক্ষ্মীকান্ত ভগবান্ ৷৷
সেই
গোবিন্দ স্বয়ং চৈতন্য গোসাঞিরূপে আবির্ভূত হয়েছেন । বদ্ধ জীবদের
উদ্ধার করার জন্য তাঁর
মতো এমন দয়ালু আর
কেউ নেই । লক্ষ্মীদেবীর
পতি শ্রীনারায়ণ পরব্যোম বা চিৎ- জগতে
অবস্থান করেন । তিনি
ঐশ্বর্য, বল, শ্রী, জ্ঞান,
যশ ও বৈরাগ্য-এই
ছয়টি ঐশ্বর্যে পরিপূর্ণ ।
গোবিন্দের
অঙ্গজ্যোতিই নির্বিশেষ ব্রহ্ম
মূল
শ্লোক চৈঃ চঃ আদি
২.১৪
যস্যপ্রভা
প্রভবতো জগদণ্ডকোটি-
কোটিত্বশেষবসুধাদিবিভূতিভিন্নম্
।
তদব্রহ্ম নিষ্কলমনন্তমশেষভূতং
গোবিন্দমাদিপুরুষং
তমহং ভজামি৷৷
“অনন্ত
কোটি ব্রহ্মাণ্ডে অনন্ত বসুধাদি বিভূতি থেকে যা পৃথক,
সেই অখণ্ড, অনন্ত ও অশেষভূত ব্রহ্মা
যাঁর প্রভা, সেই আদিপুরুষ গোবিন্দকে
আমি ভজনা করি ।
(ব্রহ্মসংহিতা ৫.৪০)
পদ্যানুবাদ
চৈঃ
চঃ আদি ২.১৫-১৬
কোটি
কোটি ব্রহ্মাণ্ডে যে ব্রহ্মের বিভূতি
।
সেই
ব্রহ্ম গোবিন্দের হয় অঙ্গকান্তি ॥
সেই
গোবিন্দ ভজি আমি, তেহোঁ
মোর পতি ।
তাঁহার
প্রসাদে মোর হয় সৃষ্টিশক্তি
॥
(ব্রহ্মা
বললেন-) যে নির্বিশেষ ব্রহ্মের
বিভূতি কোটি কোটি ব্ৰহ্মাণ্ড
জুড়ে পরিব্যাপ্ত, সেই ব্রহ্ম হচ্ছেন
গোবিন্দের অঙ্গকান্তি । আমি (ব্রহ্মা)
গোবিন্দের ভজনা করি ।
তিনি আমার পতি ।
তাঁর কৃপাতেই আমি ব্রহ্মাণ্ড সৃষ্টি
করার শক্তি লাভ করেছি।
বিভিন্ন
অবতারে বিভিন্ন বর্ণ
মূল
শ্লোক চৈঃ চঃ আদি
৩.৩৬
আসন্
বর্ণাস্ত্রয়ো হ্যস্য গৃহতোঽনুযুগং তনূঃ
শুক্লো
রক্তস্তথা পীত ইদানীং কৃষ্ণতাং
গতঃ ৷
এই বালকটি (কৃষ্ণ)
অন্য তিনটি যুগে শুক্ল, রক্ত
ও পীতবর্ণ ধারণ করে ।
এখন দ্বাপরে সে কৃষ্ণবর্ণ প্রাপ্ত
হয়েছে । (শ্রীমদ্ভাগবত ১০.৮.১৩)
পদ্যানুবাদ
চৈঃ
চঃ আদি ৩.৩৭-৩৮
শুক্ল,
রক্ত, পীতবর্ণ —এই তিন দ্যুতি
।
সত্য-ত্রেতা-কলিকালে ধরেন শ্রীপতি ॥
ইদানীং দ্বাপরে তিঁহো হৈলা কৃষ্ণবর্ণ ।
এই সব শাস্ত্রাগম-পুরাণের
মর্ম ৷
লক্ষ্মীপতি
ভগবান সত্য, ত্রেতা ও কলিযুগে যথাক্রমে
শ্বেত, রক্ত ও পীতবর্ণ
ধারণ করেন। এখন, দ্বাপর যুগে,
তিনি কৃষ্ণবর্ণ ধারণ করে অবতীর্ণ
হয়েছেন। এটিই হচ্ছে পুরাণ
ও অন্যান্য বৈদিক শাস্ত্রসমূহের সারমর্ম ।
ভগবান
ভক্তের বশীভূত হয়ে পড়েন
মূল
শ্লোক
চৈঃ
চঃ আদি ৩.১০৪
তুলসীদলমাত্রেণ
জলস্য চুলুকেন বা ।
বিক্রীনীতে
স্বমাত্মানং ভক্তেভ্যো ভক্তবৎসলঃ ॥
যে ভক্ত নিষ্ঠা সহকারে
ভগবানের উদ্দেশ্যে একটি তুলসীপত্র এবং
এক অঞ্জলি জল নিবেদন করেন,
ভক্তবৎসল ভগবান সম্পূর্ণরূপে সেই ভক্তের বশীভূত
হয়ে পড়েন । (গৌতমী তন্ত্ৰ
পদ্যানুবাদ
চৈঃ
চঃ আদি ৩.১০৫-১০৭
এই শ্লোকার্থ আচার্য করেন বিচারণ ।
কৃষ্ণকে তুলসীজল দেয় যেই জন
৷৷
তার ঋণ শোধিতে
কৃষ্ণ করেন চিন্তন ৷
‘জল-তুলসীর সম কিছু ঘরে
নাহি ধন' ॥
তবে আত্মা বেচি'
করে ঋণের শোধন ।
এত ভাবি আচার্য
করেন আরাধন ॥
অদ্বৈত
আচার্য প্ৰভু এই শ্লোকটির অর্থ
বিচার করলেন এভাবে - কৃষ্ণকে যিনি তুলসী ও
জল নিবেদন করেন, তাঁর সেই দান
পরিশোধ করতে নিরুপায় হয়ে
ভগবান চিন্তা করেন, 'জল- তুলসীর সমগোত্রীয়
কোন ধন আমার নেই
।' এভাবেই ভগবান ভক্তের কাছে নিজেকে অর্পণ
করে সমস্ত ঋণ পরিশোধ করেন
।” সেই কথা বিবেচনা
করে শ্রীঅদ্বৈত আচার্য ভগবানের আরাধনা করতে শুরু করেন।
ভক্তবাঞ্ছাপূর্তিহেতু
ভগবানের অসংখ্য রূপ পরিগ্রহ
মূল
শ্লোক
চৈঃ
চঃ আদি ৩.১১
ত্বং
ভক্তিযোগপরিভাবিতহৃৎসরোজ
আসে
শ্রুতেক্ষিতপথো ননু নাথ পুংসাম্
।
যদ্যদ্ধিয়া ত উরুগায় বিভাবয়ন্তি
তত্তদ্বপুঃ
প্রণয়সে সদনুগ্ৰহায় ৷
“হে
নাথ! তুমি সর্বদা তোমার
ভক্তদের শ্রবণ ও দর্শনপথে বিহার
কর । ভক্তিযোগপূত তাঁদের
হৃদয়পদ্মে তুমি সর্বদা অবস্থান
কর । হে উরুগায়!
ভক্তবৃন্দ তাঁদের হৃদয়ে তোমার যে নিত্য স্বরূপ
বিভাবন করেন, তাঁদের প্রতি অনুগ্রহ করে তুমি তাঁদের
কাছে তোমার সেই নিত্য স্বরূপ
প্রকট করে থাক।”(শ্রীমদ্ভাগবত ৩.৯.১১)
পদ্যানুবাদ
চৈঃ
চঃ আদি ৩.১১.12
এই শ্লোকের অর্থ কহি সংক্ষেপের
সার ।
ভক্তের ইচ্ছায় কৃষ্ণের সর্ব অবতার ৷৷
১১২ ৷
এই শ্লোকের সার অর্থ হচ্ছে
যে, ভগবান শ্রীকৃষ্ণ ভক্তের ইচ্ছাক্রমে তাঁর অসংখ্য নিত্যরূপে
অবতীর্ণ হন।
রাধা-কৃষ্ণের চিন্ময় স্বরূপ
মূল
শ্লোক
চৈঃ
চঃ আদি ৪.৫৫
রাধা
কৃষ্ণপ্রণয়বিকৃতিহ্লাদিনীশক্তির
স্মা-
দেকাত্মানাবপি
ভুবি পুরা দেহভেদং গতৌ
তৌ।
চৈতন্যাখ্যং প্রকটমধুনা তদ্বয়ঞ্চৈক্যমাপ্তং
রাধাভাবদ্যুতিসুবলিতং নৌমি কৃষ্ণস্বরূপম্ ॥
“রাধা-কৃষ্ণের প্রণয় ভগবানের হ্লাদিনী শক্তির বিকার । শ্রীমতী রাধারাণী
ও শ্রীকৃষ্ণ একাত্মা হলেও তাঁরা অনাদিকাল
থেকে গোলোকে পৃথক দেহ ধারণ
করে আছেন । এখন
সেই দুই চিন্ময় দেহ
পুনরায় একত্রে যুক্ত হয়ে শ্রীকৃষ্ণচৈতন্য নামে
প্রকট হয়েছেন । শ্রীমতী রাধারাণীর
এই ভাব ও কান্তিযুক্ত
শ্রীকৃষ্ণস্বরূপ শ্ৰীকৃষ্ণচৈতন্যকে আমি প্রণতি নিবেদন
করি। ”
পদ্যানুবাদ
চৈঃ
চঃ আদি ৪.৫৬-৫৭
রাধাকৃষ্ণ
এক আত্মা, দুই দেহ ধরি'।
অন্যোন্যে বিলসে রস আস্বাদন করি'
৷
সেই দুই এক
এবে চৈতন্য গোসাঞি ।
রস আস্বাদিতে দোঁহে
হৈলা একঠাঁই ॥
শ্রীমতী
রাধারাণী এবং শ্রীকৃষ্ণ এক
ও অভিন্ন, কিন্তু তাঁরা দুটি পৃথক দেহ
ধারণ করেছেন । এভাবেই তাঁরা
পরস্পরের প্রেমরস আস্বাদন করেন। রস আস্বাদন করার
জন্য এখন তাঁরা দুজন
এক দেহ ধারণ করে
শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুরূপে আবির্ভূত হয়েছেন।
সাধুসঙ্গে
জড় অস্তিত্বের নাশ
মূল
শ্লোক
চৈঃ
চঃ মধ্য ২২.৪৬
ভবাপবর্গো
ভ্রমতো যদা ভবে-
জনস্য তর্হ্যচ্যুত সৎসমাগমঃ ।
সৎসঙ্গমো যহি তদৈব সতৌ
পরাবরেশে ত্বয়ি জায়তে রতিঃ ৷৷
হে অচ্যুত! সংসারে ভ্রমণ করতে করতে কেউ
যদি ভববন্ধন থেকে মুক্ত হওয়ার
যোগ্যতা অর্জন করেন, তাহলে তিনি ভগবদ্ভক্তদের সঙ্গলাভ করার সৌভাগ্য
অর্জন করেন। সেই সাধুসঙ্গের প্রভাবে,
সমস্ত জগতের ঈশ্বর এবং ভক্তদের পরম
গতি, আপনার প্রতি তার ভক্তির উদয়
হয় । (শ্ৰীঃভাঃ ১০.৫১.৫৩) [সনাতন
শিক্ষা]
পদ্যানুবাদ
চৈঃ
চঃ মধ্য ২২.85
কোন
ভাগ্যে কারো সংসার ক্ষয়োন্মুখ
হয় ।
সাধুসঙ্গে
তবে কৃষ্ণ রতি উপজয় ৷৷
ভাগ্যক্রমে
কেউ যদি সংসার সমুদ্র
উত্তীর্ণ হওয়ার যোগ্যতা অর্জন করেন এবং এইভাবে
তার ভববন্ধন ক্ষয় উন্মুখ হয়, তা হলে
সাধুসঙ্গের প্রভাবে তার কৃষ্ণের প্রতি
আসক্তির উদয় হয় ।
শ্রীকৃষ্ণ-সংকীর্তন বিশেষভাবে জয়যুক্ত হউন
মূল
শ্লোক
চৈঃ
চঃ অন্ত্য ২০.55
চেতোদর্পণমাৰ্জনং
ভবমহাদাবাগ্নিনির্বাপণ
শ্রেয়ঃকৈরবচন্দ্রিকাবিতরণং
বিদ্যাবধূজীবনম্ ।
আনন্দাম্বুধিবৰ্ধনং
প্রতিপদং পূর্ণামৃতাস্বাদনং
সর্বাত্মম্নপনং পরং বিজয়তে শ্ৰীকৃষ্ণসঙ্কীৰ্তনম্
॥
চিত্তরূপ
দর্পণের মার্জনকারী, ভবরূপ মহাদাবাগ্নির নির্বাপণকারী; জীবের মঙ্গলরূপ কৈরবচন্দ্রিকা বিতরণকারী, বিদ্যাবধূর জীবন স্বরূপ, আনন্দ-সমুদ্রের বর্ধনকারী, পদে পদে পূর্ণ
অমৃত আস্বাদন স্বরূপ এবং সর্ব স্বরূপের
শীতলকারী শ্রীকৃষ্ণ-সংকীর্তন বিশেষভাবে জয়যুক্ত হউন ।
পদ্যানুবাদ
চৈঃ
চঃ অন্ত্য ২০.১১, ১৩-১৪
নামসঙ্কীর্তন
হইতে সর্বানৰ্থ-নাশ ৷
সর্ব-শুভোদয়, কৃষ্ণ-প্রেমের উল্লাস ৷
সঙ্কীৰ্তন হৈতে পাপ-সংসার-নাশন ।
চিত্তশুদ্ধি, সর্বভক্তিসাধন-উম ৷৷
কৃষ্ণপ্রেমোদাম,
প্রেমামৃত-আস্বাদন ।
কৃষ্ণপ্রাপ্তি,
সেবামৃত-সমুদ্রে মজ্জন ৷৷
শ্রীকৃষ্ণের
দিব্যনাম কীর্তন করার ফলে সমস্ত
অনর্থ থেকে মুক্ত হওয়া
যায় । তার ফলে
সর্বপ্রকার মঙ্গলের উদয় হয় এবং
কৃষ্ণপ্রেম তরঙ্গের ধারা প্রবাহিত হতে
শুরু করে । হরেকৃষ্ণ
মহামন্ত্র সংকীর্তন করার ফলে সংসারের
সমস্ত পাপ ধ্বংস হয়,
হৃদয় নির্মল হয় এবং সর্বপ্রকার
ভক্তির উদয় হয়। সংকীর্তনের
ফলে কৃষ্ণপ্রেমের উদয় হয়, প্রেমামৃতের
আস্বাদন হয়, শ্রীকৃষ্ণের সঙ্গ
লাভ হয় এবং তাঁর
সেবারূপ অমৃতের সমুদ্রে নিমজ্জিত হওয়া যায় ।
সর্বশক্তি
সম্পন্ন কৃষ্ণনাম
মূল
শ্লোক
চৈঃ
চঃ অন্ত্য ২০.
নাম্নামকারি
বহুধা নিজসর্বশক্তি-
স্তত্রার্পিতা
নিয়মিতঃ স্মরণে ন কালঃ ।
এতাদৃশী তব কৃপা ভগবন্মমাপি
দুর্দৈবমীদৃশমিহাজনি
নানুরাগঃ ॥
‘হে
পরমেশ্বর ভগবান, তোমার নামই জীবের সর্বমঙ্গল
বিধান করে, এইজন্য তোমার
‘কৃষ্ণ’, ‘গোবিন্দ’ আদি
বহুবিধ নাম তুমি বিস্তার
করেছ। সেই নামে তুমি
তোমার সর্বশক্তি অর্পণ করেছ এবং সেই
নাম স্মরণের স্থান-কাল-পাত্র ইত্যাদির
কোন রকম বিধি বা
বিচার করনি । হে
প্রভু, জীবের প্রতি এইভাবে কৃপা করে তুমি
তোমার নামকে সুলভ করেছ, তথাপি
আমার এমনই দুর্দৈব যে,
সেই নাম গ্রহণ করার
সময় আমি অপরাধ করি
এবং তার ফলে তোমার
সুলভ নামেও আমার অনুরাগ জন্মায়
না।’
পদ্যানুবাদ
চৈঃ
চঃ অন্ত্য ২০.59
অনেক-লোকের বাঞ্ছা—অনেক-প্রকার ।
কৃপাতে করিল অনেক-নামের
প্রচার ॥
খাইতে শুইতে যথা তথা নাম
লয় ।
কাল-দেশ-নিয়ম নাহি,
সর্বসিদ্ধি হয় ৷
“সর্বশক্তি
নামে দিলা করিয়া বিভাগ
৷
আমার
দুর্দৈব, –নামে নাহি অনুরাগ!”
॥
যেহেতু
বিভিন্ন মানুষের বাসনা ভিন্ন, তাই তুমি কৃপা
করে তোমার অনেক নাম প্রচার
করেছ । খাওয়ার সময়,
শোয়ার সময়, যেখানে সেখানে ভগবানের নাম গ্রহণ করা
যায় । এই নাম
গ্রহণে দেশ-কাল-পাত্র
ইত্যাদির কোন বিচার নেই;
এবং যিনি এই নাম
গ্রহণ করেন তাঁর সর্বসিদ্ধি
হয় । তুমি তোমার
প্রতিটি নামে তোমার সর্বশক্তি
অর্পণ করেছ, কিন্তু আমার এমনই দুর্দৈব
যে সেই নামের প্রতি
আমার কোন অনুরাগ নেই
।
নাম
কীর্তনের অধিকারী কে ?
মূল
শ্লোক
চৈঃ
চঃ অন্ত্য ২০.
তৃণাদপি
সুনীচেন তরোরিব সহিষ্ণুনা ।
অমানিনা
মানদেন কীর্তনীয়ঃ সদা হরিঃ ৷৷
যিনি
নিজেকে সকলের পদদলিত তৃণের থেকেও ক্ষুদ্র বলে মনে করেন,
যিনি বৃক্ষের মতো সহিষ্ণু; যিনি
নিজে মান শূন্য এবং
অন্য সকলকে সম্মান প্রদর্শন করেন, তিনি সর্বক্ষণ ভগবানের
দিব্যনাম কীর্তনের অধিকারী।
পদ্যানুবাদ
চৈঃ
চঃ অন্ত্য ২০.55-56
উত্তম হঞা আপনাকে মানে
তৃণাধম ।
দুই প্রকারে সহিষ্ণুতা
করে বৃক্ষসম ৷৷
বৃক্ষ যেন কাটিলেহ কিছু
না বোলয় ।
শুকাঞা মৈলেহ কারে পানী না
মাগয় ৷৷
যেই যে মাগয়ে,
তারে দেয় আপন-ধন
।
ঘর্ম-বৃষ্টি সহে,
আনের করয়ে রক্ষণ ৷
উত্তম
হঞা বৈষ্ণব হবে নিরভিমান
জীবে সম্মান দিবে
জানি’
‘কৃষ্ণ’-অধিষ্ঠান
॥
এইমত হঞা যেই
কৃষ্ণনাম লয় ৷
শ্রীকৃষ্ণচরণে তাঁর প্ৰেম উপজয়
৷৷
হরেকৃষ্ণ
মহামন্ত্র কীর্তনকারীর লক্ষণ হচ্ছে—তিনি উত্তম হওয়া
সত্ত্বেও নিজেকে তৃণের থেকেও দীনতর বলে মনে করেন,
এবং তিনি বৃক্ষের মতো
দুই প্রকার সহিষ্ণুতা প্রদর্শন করেন । বৃক্ষকে
কাটলেও সে কোন রকম
প্রতিবাদ করে না, এবং
শুকিয়ে মরে গেলেও কারোর
কাছে জল চাহে না
। যেই তার কাছে
চায় তাকেই বৃক্ষ তার ফল, ফুল
আদি প্রিয়ধন দান করে ।
সে নিজে প্রখর সূর্য-কিরণ এবং প্রবল
বৃষ্টি সহ্য করে অন্যদের
তা থেকে রক্ষা করে
। অতি উত্তম হওয়া
সত্ত্বেও বৈষ্ণব নিরভিমান, এবং তিনি সকলের
হৃদয়ে কৃষ্ণ বিরাজ করছে জেনে, সমস্ত
জীবদের সম্মান করেন । এই
রকম হয়ে যিনি কৃষ্ণনাম
গ্রহণ করেন, তিনি অবশ্যই শ্রীকৃষ্ণের শ্রীপাদপদ্মে প্রেমভক্তি লাভ করেন ।
চৈঃ
চঃ আদি ১৭.২৬-২৭
তৃণ
হৈতে নীচ হঞা সদা
লবে নাম ৷
আপনি
নিরভিমানী, অন্যে দিবে মান ৷৷
তরুসম
সহিষ্ণুতা বৈষ্ণব করিবে।
ভর্ৎসন-তাড়নে কাকে কিছু না
বলিবে ৷৷
ভগবানের
দিব্যনাম নিরন্তর স্মরণ করতে হলে, পথের
পাশে পড়ে থাকা একটি
তৃণ থেকেও দীনতর হতে হবে এবং
নিরভিমানী হয়ে অন্য সকলকে
সম্মান প্রদর্শন করতে হবে ।
ভগবানের নাম কীর্তনে রত
ভক্তকে তরুর মতো সহিষ্ণু
হতে হবে । কেউ
যদি তাকে ভর্ৎসনা করে
অথবা তিরস্কার করে, তা হলেও
তার প্রতিবাদে তার কিছু বলা
উচিত নয়।
চৈঃ
চঃ আদি ১৭.৩০,
৩২-৩৩
সদা
নাম লইব, যথা-লাভেতে
সন্তোষ ।
এইত
আচার করে ভক্তিধর্ম-পোষ
॥
ঊর্ধ্ববাহু করি' কছোঁ, শুন,
সর্বলোক।
নাম-সূত্রে গাঁথি' পর কণ্ঠে এই
শ্লোক ৷৷
প্রভু-আজ্ঞায় কর এই শ্লোক
আচরণ ৷
অবশ্য
পাইবে তবে শ্রীকৃষ্ণ-চরণ
৷৷
গভীর
নিষ্ঠা সহকারে সর্বক্ষণ নাম গ্রহণ করতে
হবে এবং যা পাওয়া যায়
তাতেই সন্তুষ্ট থাকা উচিত ।
এই ধরনের আচরণ করলে ভগবদ্ভক্তি
পোষণ করা যায় ।
ঊর্ধ্ববাহু হয়ে আমি ঘোষণা
করছি, আপনারা সকলে শুনুন! এই
শ্লোকটিকে নামরূপ সূত্রের দ্বারা গেঁথে কণ্ঠে ধারণ করুন, যাতে
নিরন্তর তা স্মরণ করতে
পারেন । শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর
আজ্ঞা অনুসারে নিষ্ঠাভরে এই শ্লোকটির আচরণ
করা অবশ্য কর্তব্য। কেউ যদি কেবল
শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু ও গোস্বামীদের পদাঙ্ক
অনুসরণ করেন, তা হলে তিনি
জীবনের চরম লক্ষ্য শ্রীকৃষ্ণের
পাদপদ্ম অবশ্যই লাভ করতে পারবেন
।
ভক্তের
একমাত্র কামনা
মূল
শ্লোক
চৈঃ
চঃ অন্ত্য ২০.
ন ধনং ন জনং
ন সুন্দরীং
কবিতাং বা জগদীশ কাময়ে
৷
মম জন্মনি জন্মনীশ্বরে
ভবতাদ্ভক্তিরহৈতুকী
ত্বয়ি ৷৷
‘হে
জগদীশ! আমি ধন, জন,
বা সুন্দরী কবিতা কামনা করি না; আমি
কেবল এই কামনা করি
যে, জন্ম জন্মান্তরে যেন
আমি তোমার প্রতি অহৈতুকী ভক্তি লাভ করতে পারি।'
পদ্যানুবাদ
চৈঃ
চঃ অন্ত্য ২০.২৭, ২৮,
৩০
কহিতে
কহিতে প্রভুর দৈন্য বাড়িলা ৷
‘শুদ্ধভক্তি' কৃষ্ণ-ঠাঞি মাগিতে লাগিলা
৷
প্রেমের স্বভাব—যাঁহা প্রেমের সম্বন্ধ ৷
সেই মানে,–‘কৃষ্ণে
মোর নাহি প্ৰেম-গন্ধ'
॥
“ধন,
জন নাহি মাগোঁ, কবিতা
সুন্দরী ।
‘শুদ্ধভক্তি’
দেহ’ মোরে,
কৃষ্ণ! কৃপা করি' ৷
এইভাবে
বলতে বলতে শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর
দৈন্য ভাব বর্ধিত হল,
তিনি শ্রীকৃষ্ণের কাছে প্রার্থনা করতে
লাগলেন যাতে তিনি তাঁকে
শুদ্ধভক্তি দান করেন ।
ভগবৎ-প্রেমের স্বভাবই হচ্ছে, যখন ভগবানের সঙ্গে
প্রেমের সম্পর্ক গড়ে উঠে তখন
ভক্ত নিজেকে ভক্ত বলে মনে
করেন না, পক্ষান্তরে, তার
সবসময় মনে হয় যে
তিনি কৃষ্ণ-প্রেমের এককণাও লাভ করতে পারেননি
। হে কৃষ্ণ! আমি
তোমার কাছে ধনসম্পদ চাই
না, অনুগতজন চাইনা, সুন্দরী স্ত্রী অথবা সকাম কর্মের
ফল স্বরূপ ভোগ চাই না
। তোমার কাছে আমার একমাত্র
প্রার্থনা, তুমি কৃপা করে
আমাকে শুদ্ধভক্তি দান কর।
ভক্তের
স্থিতি
মূল
শ্লোক
চৈঃ
চঃ অন্ত্য 20.35
অয়ি
নন্দতনুজ কিঙ্করং পতিতং মাং বিষমে ভবাম্বুধৌ
।
কৃপয়া
তব পাদ পঙ্কজস্থিত ধূলীসদৃশং
বিচিন্তয় ৷৷
হে নন্দনন্দন, আমি তোমার নিত্য
দাস, কিন্তু আমার সকর্ম- বিপাকে
আমি এই ভয়ঙ্কর ভব-সমুদ্রে পতিত হয়েছি ।
তুমি কৃপা । করে
তোমার পাদপদ্মস্থিত ধূলিকণা সদৃশ আমাকে চিন্তা
কর ।
পদ্যানুবাদ
'চৈঃ
চঃ অন্ত্য ২০.৩১, ৩৩,
৩৪
অতিদৈন্যে
পুনঃ মাগে দাস্যভক্তি-দান
৷
আপনারে করে সংসারী জীব-অভিমান ৷৷
“তোমার নিত্যদাস মুই, তোমা পাসরিয়া
।
পড়িয়াছোঁ ভবার্ণবে মায়াবদ্ধ হঞা ৷৷
কৃপা করি' কর
মোরে পদধূলি-সম ।
তোমার
সেবক করোঁ তোমার সেবন
॥”
অত্যন্ত
দৈন্য সহকারে নিজেকে এই জড় জগতের
একজন বদ্ধ জীব বলে
মনে করে, শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু
পুনরায় ভগবানের কাছে প্রার্থনা করতে
লাগলেন, তিনি যেন তাঁকে
দাস্যভক্তি দান করেন ।
আমি তোমার নিত্য দাস, কিন্তু তোমাকে
ভুলে আমি মায়াবদ্ধ হয়ে ভব-সমুদ্রে পতিত হয়েছি। কৃপা
করে তুমি আমাকে তোমার
শ্রীপাদপদ্মের ধূলিকণারূপে স্থান দাও, যাতে আমি
তোমার নিত্য সেবক হয়ে তোমার
সেবা করতে পারি ।
পূর্ণতার
বাহ্য লক্ষণ
মূল
শ্লোক
চৈঃ
চঃ অন্ত্য ২০.36
নয়নং
গলদশ্রুধারয়া বদনং গদ-রুদ্ধয়া
গিরা ।
পুলকৈর্নিচিতং বপুঃ কদা তব
নাম-গ্রহণে ভবিষ্যতি ৷৷
‘হে
প্রভু, তোমার নাম-গ্রহণে কবে
আমার নয়নযুগল গলদশ্রুধারায় শোভিত হবে ? বাক্য নিঃসরণ সময়ে বদনে গদ্গদ স্বর
বের হবে এবং আমার
সমস্ত শরীর পুলকাঞ্চিত হবে
?”
পদ্যানুবাদ
চৈঃ
চঃ অন্ত্য ২০.৩१
“প্রেমধন
বিনা ব্যর্থ দরিদ্র জীবন ।
‘দাস'
করি' বেতন মোরে দেহ
প্রেমধন ॥ ”
“ভগবৎ-প্রেমরূপ ধন বিনা আমার
দরিদ্র জীবন ব্যর্থ ।
তাই তোমার কাছে আমার প্রার্থনা
আমাকে তোমার দাস করে বেতন
স্বরূপ প্রেমধন দান কর।”
পূর্ণতার
আভ্যন্তরীণ লক্ষণ
মূল
শ্লোক
চৈঃ
চঃ অন্ত্য ২০.৩৯
যুগায়িতং
নিমেষেণ চক্ষুষা প্রাবৃষায়িতম্ ।
শূন্যায়িতং জগৎ সর্বং গোবিন্দ-বিরহেণ মে ৷
হে গোবিন্দ, তোমার অদর্শনে আমার এক নিমেষকে
এক যুগ বলে মনে
হচ্ছে; চক্ষু থেকে বর্ষার ধারার
মতো অশ্রুধারা ঝরে পড়ছে, এবং
সমস্ত জগৎ শূন্য বলে
মনে হচ্ছে।”
পদ্যানুবাদ
চৈঃ
চঃ অন্ত্য ২০.80,85
উদ্বেগে
দিবস না যায়, ‘ক্ষণ’ হৈল
‘যুগ’-সম ।
বর্ষার মেঘপ্রায় অশ্রু বরিষে নয়ন ৷
গোবিন্দ-বিরহে শূন্য হইল ত্রিভুবন ।
তুষানলে পোড়ে,—যেন না যায়
জীবন ৷
উদ্বেগে
আমার দিন কাটে না,
কেননা এক ক্ষণকে যুগ
বলে মনে হয় ।
আমার চোখ দিয়ে বর্ষার
ধারার মতো অশ্রুধারা ঝরে
পড়ছে । গোবিন্দ-বিরহে
ত্রিভুবন শূন্য হয়েছে । আমার মনে
হচ্ছে যেন আমি জীবন্ত
অবস্থায় তুষানলে দগ্ধ হচ্ছি ।
পূর্ণতার
নিষ্ঠা
মূল
শ্লোক
চৈঃ
চঃ অন্ত ২০.৪৭
আশিষ্য
বা পাদরতাং পিনষ্ট মামদর্শনান্মমহতাং করোতু বা ।
যথা তথা বা
বিদধাতু লম্পটো মৎপ্রাণনাথস্ত স এব নাপরঃ
৷
এই পাদরতা দাসীকে কৃষ্ণ আলিঙ্গনপূর্বক পেষণ করুক অথবা
দেখা না দিয়ে মর্মাহতই
করুক, সে—লম্পট পুরুষ, আমার প্রতি যেমনই
আচরণ করুক না কেন,
সে অন্য কেউ নয়,
আমারই প্ৰাণনাথ।'
পদ্যানুবাদ
চৈঃ
চঃ অন্ত ২০.৪৮
আমি—কৃষ্ণপদ-দাসী, তেঁহো—রসসুখরাশি,
কিবা
না দেয় দরশন, না
জানে মোর তনুমন,
আলিঙ্গিয়া
করে আত্মসাথ ।
তবু
তেঁহো—মোর প্রাণনাথ ৷৷
আমি
কৃষ্ণের পাদরতা দাসী । সে
রসসুখের মূর্তবিগ্রহ । সে আমাকে
গাঢ় আলিঙ্গন করে আত্মসাৎ করতে
পারে, অথবা আমাকে দর্শন
না দিয়ে আমার দেহ ও
মন ব্যথিত করতে পারে। কিন্তু
তা হলেও, সে আমার প্রাণনাথ
।
চৈঃ
চঃ অন্ত ২০.89
সখি
হে, শুন মোর মনের
নিশ্চয় ।
কিবা
অনুরাগ করে, কিবা দুঃখ
দিয়া মারে,
মোর
প্রাণেশ্বর কৃষ্ণ—অন্য নয় ॥
হে সখি, আমার মনের
কথা শোন । কৃষ্ণ
আমার প্রতি অনুরাগ প্রদর্শন করুক অথবা দুঃখ
দিয়ে আমাকে মেরে ফেলুক, সে
আমার প্রাণেশ্বর, অন্য কেউ নয়
।
চৈঃ
চঃ অন্ত ২০.৫০
ছাড়ি'
অন্য নারীগণ, মোর বশ তনুমন,
মোর সৌভাগ্য প্রকট
করিয়া ।
তা-সবারে দেয়
পীড়া, আমা-সনে করে
ক্রীড়া,
সেই নারীগণে দেখাঞা
৷৷
কখনও
কখনও কৃষ্ণ অন্য সমস্ত গোপীদের
সঙ্গ ত্যাগ করে সর্বতোভাবে আমার
বশীভূত হয় । এইভাবে
সে আমার সৌভাগ্য প্রকট
করে, এবং সেই সমস্ত
নারীদের দেখিয়ে আমার সঙ্গে লীলা-খেলা করে তাদের
ব্যথা দেয়।
চৈঃ
চঃ অন্ত ২০.৫
কিবা
তেঁহা লম্পট, শঠ, ধৃষ্ট সকপট,
অন্য
নারীগণ করি' সাথ ।
মোর
দিতে মনঃপীড়া, মোর আগে করে
ক্রীড়া,
তবু
তেঁহো—মোর প্রাণনাথ ৷৷
অথবা,
যেহেতু সে লম্পট, শঠ,
ধৃষ্ট এবং কপট, তাই
সে আমাকে মনঃপীড়া দেবার জন্য, আমার সামনে অন্য
নারীদের সঙ্গে ক্রীড়া করে, কিন্তু তা
হলেও সে আমার প্রাণনাথ
।
চৈঃ
চঃ অন্ত ২০.৫২
না গণি আপন-দুঃখ
সবে বাঞ্ছি তাঁর সুখ,
তাঁর
সুখ—আমার তাৎপর্য ।
মোরে যদি দিয়া
দুঃখ, তাঁর হৈল মহাসুখ,
সেই দুঃখ—মোর সুখবৰ্য ৷
আমি
আমার নিজের দুঃখের কথা ভাবি না
। আমি কেবল কৃষ্ণের
সুখই কামনা করি, কেননা তাঁর
সুখই আমার জীবনের উদ্দেশ্য
। তাই আমাকে দুঃখ
দিয়ে যদি সে মহাসুখ
পায়, তাহলে সে দুঃখই আমার সবচাইতে বড়
সুখ ।
শিক্ষাষ্টকের
মাহাত্ম্য
চৈঃ
চঃ অন্ত ২০.৬৫
প্রভুর শিক্ষাষ্টক
-শ্লোক যেই পড়ে, শুনে।
কৃষ্ণে
প্রেমভক্তি তার বাড়ে দিনে-দিনে ॥
শ্রীচৈতন্য
মহাপ্রভু এই শিক্ষাষ্টক শ্লোক
যেই পড়ে, বা শুনে, দিনে
দিনে কৃষ্ণের প্রতি তাঁর প্রেমভক্তি বাড়তে
থাকে ।
বুদ্ধিমান
ব্যক্তিমাত্রই কৃষ্ণভজন করেন
মূল
শ্লোক
চৈঃ
চঃ মধ্য ২২.৩৬,
২৪.৯০, ২৪.১৯৭
অকাম
সর্বকামো বা মোক্ষকাম উদারধীঃ
।
তীব্রেণ
ভক্তিযোগেন যজেত পুরুষং পরম্।।
যে ব্যক্তির বুদ্ধি উদার, তিনি সবরকম জড়
কামনা যুক্তই হোন, অথবা সমস্ত
জড়বাসনা থেকে মুক্তই হোন,
অথবা জড়জগতের বন্ধন থেকে মুক্তিলাভের প্রয়াসীই
হোন, তাঁর কর্তব্য সর্বতোভাবে
পরমেশ্বর ভগবানের আরাধনা করা । (শ্রীঃভাঃ
২.৩.১০)
পদ্যানুবাদ
চৈঃ
চঃ মধ্য ২২.৩৫,৩৭,৪১
ভুক্তি-মুক্তি-সিদ্ধি-কামী ‘সুবুদ্ধি’ যদি হয়।
গাঢ়-ভক্তি-যোগে
তবে কৃষ্ণেরে ভজয়।
অন্য-কামী যদি
করে কৃষ্ণের ভজন।
না মাগিতেহ কৃষ্ণ
তারে দেন স্ব-চরণ।
কাম লাগি' কৃষ্ণে
ভজে, পায় কৃষ্ণ-রসে।
কাম ছাড়ি’ ‘দাস' হৈতে হয়
অভিলাষে ।
অসৎ
সঙ্গের প্রভাবে, জীব জড়ভোগ, মুক্তি
বা ব্ৰহ্মসাযুজ্য, অথবা যোগ সিদ্ধি
কামনা করে । যদি
কোন সৎসঙ্গে তাঁর সুবুদ্ধির উদয়
হয়, তবে ভুক্তি-মুক্তি-সিদ্ধি-পিপাসা পরিত্যাগ করে সে গাঢ় শুদ্ধভক্তি
সহকারে কৃষ্ণকে ভজন করে ।
মুক্তি ভুক্তি ও সিদ্ধিকামীরা শুদ্ধভক্তিকামী
নন, তাঁরা কোন ভাগ্যক্রমে শুদ্ধ
কৃষ্ণভজনে প্রবৃত্ত হলে, সাধন ভক্তির
যে ফল প্রেম, তা
যদিও তাদের উদ্দেশ্য না থাকে, তথাপি
কৃষ্ণ কৃপা করে তা
তাদের দেন । জড়
কাম চরিতার্থ করার উদ্দেশ্যে কেউ
কৃষ্ণভজন করেন, তাহলে তাঁর সেই কাম
দূর হয়ে যায় এবং
তিনি কৃষ্ণরস প্রাপ্ত হন। কৃষ্ণভজন এমনই
পবিত্র বস্তু যে তা অনুশীলন
করার ফলে, অচিরে সমস্ত
কাম থেকে মুক্ত হয়ে
কৃষ্ণের দাস হওয়ার অভিলাষ
হয় ।
চৈঃ
চঃ মধ্য ২৪.91-93
বুদ্ধিমান্-অর্থে—যদি ‘বিচারজ্ঞ’ হয়।
নিজ-কাম লাগিহ
তবে কৃষ্ণেরে ভজয় ৷৷
ভক্তি বিনু কোন সাধন
দিতে নারে ফল।
সব ফল দেয়
ভক্তি স্বতন্ত্ৰ প্ৰবল ৷৷
অজাগলস্তন-ন্যায় অন্য সাধন ।
অতএব হরি ভজে
বুদ্ধিমান্ জন ৷৷
উপাসক
যদি ‘উদারধীঃ' অর্থাৎ বুদ্ধিমান ও বিচারজ্ঞ হন,
তাহলে কামনা বাসনা সত্ত্বেও তিনি শ্রীকৃষ্ণের ভজন
করেন। ভক্তিবিনা কোন সাধনাই ফলপ্রসু
হয় না। কিন্তু, ভক্তি
এতই প্রবল এবং স্বতন্ত্র যে
তা সমস্ত ইপ্সিত ফল প্রদানে সক্ষম
। ভক্তি ব্যতীত অন্যান্য সাধনা অজাগল স্তনের মতো । তাই
বুদ্ধিমান ব্যক্তিরা, অন্যান্য সমস্ত পন্থা পরিত্যাগ করে, ভগবানের ভজনা
করেন ।
চৈঃ
চঃ মধ্য ২৪.১৯৬,
১৯৮
উদার
মহতী যাঁর সর্বোত্তমা বুদ্ধি
।
নানা কামে ভজে,
তবু পায় ভক্তি-সিদ্ধি
।।
ভক্তি-প্রভাব, – সেই কাম ছাড়াঞা
৷
কৃষ্ণপদে ভক্তি করায় গুণে আকর্ষিয়া ।।
কোন
ব্যক্তি যদি যথার্থই বুদ্ধিমান
এবং উদার হন, তাহলে
জড় ভোগ বাসনা চরিতার্থ
করার জন্য শ্রীকৃষ্ণের ভজনা
করলেও শুদ্ধভক্তি লাভ করেন। ভগবদ্ভক্তির
এমনই প্রভাব যে তা ধীরে
ধীরে সমস্ত কামনা বাসনা থেকে মুক্ত করে
শ্রীকৃষ্ণের গুণের দ্বারা আকৃষ্ট করে জীবকে শ্রীকৃষ্ণের
শ্রীপাদপদ্মে শুদ্ধভক্তি প্রদান করে।
কোন মন্তব্য নেই