পরিশিষ্ট সারবস্তু কি ? শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু এবং রামানন্দ রায় সংবাদ
পরিশিষ্ট
সারবস্তু
কি ?
শ্রীচৈতন্য
মহাপ্রভু এবং রামানন্দ রায়
সংবাদ
বিদ্যা—কৃষ্ণভক্তি
চৈঃ
চঃ মধ্য ৮.২৪৫
প্রভু কহে,— কোন্ বিদ্যা বিদ্যা-মধ্যে সার? রায় কহে,—
কৃষ্ণভক্তি বিনা বিদ্যা নাহি
আর ॥
মহাপ্রভু
তাকে জিজ্ঞাসা করলেন, সমস্ত বিদ্যার মধ্যে কোন বিদ্যা সার?
রামানন্দ রায় উত্তর দিলেন,
কৃষ্ণভক্তি ছাড়া আর কোন বিদ্যা
নেই।
কীর্তি—কৃষ্ণভক্ত-রূপে খ্যাতি
চৈঃ
চঃ মধ্য ৮.২৪৬
কীর্তিগণ-মধ্যে জীবের কোন্ বড় কীর্তি?
কৃষ্ণভক্ত বলিয়া যাঁহার হয় খ্যাতি ॥
শ্রীচৈতন্য
মহাপ্রভু তখন রামানন্দ রায়কে
জিজ্ঞাসা করলেন, সমস্ত কীর্তির মধ্যে কোন কীর্তি শ্রেষ্ঠ?
রামানন্দ রায় উত্তর দিলেন,
কৃষ্ণভক্ত বলে যিনি খ্যাতি
অর্জন করেছেন, তিনিই সবচাইতে বড় কীর্তিমান।
সম্পত্তি— রাধাকৃষ্ণ
প্রেম
চৈঃ
চঃ মধ্য ৮.২89
সম্পত্তির
মধ্যে জীবের কোন্ সম্পত্তি গণি?
রাধাকৃষ্ণ
প্রেম যাঁর, সেই বড় ধনী
৷
শ্রীচৈতন্য
মহাপ্রভু জিজ্ঞাসা করলেন, জীবের সম্পত্তির মধ্যে কোন্ সম্পত্তি সর্বশ্রেষ্ঠ?
রামানন্দ রায় উত্তর দিলেন,
রাধাকৃষ্ণে যাঁর প্রেম, তিনিই
সবচাইতে ধনী।”
দুঃখ— কৃষ্ণভক্ত-বিরহ
চৈঃ
চঃ মধ্য ৮.২৪৮
দুঃখ-মধ্যে কোন্ দুঃখ হয়
গুরুতর? কৃষ্ণভক্ত-বিরহ বিনা দুঃখ
নাহি দেখি পর ॥
শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু জিজ্ঞাসা করলেন, “সমস্ত দুঃখের মধ্যে কোন্ দুঃখ সবচাইতে
গুরুতর?” শ্রীরামানন্দ রায় উত্তর দিলেন,
“কৃষ্ণভক্ত-বিরহ থেকে অধিক
গুরুতর দুঃখ আমি আর
দেখি না।”
মুক্ত—কৃষ্ণপ্রেম
আছে যাঁর
চৈঃ
চঃ মধ্য ৮.২৪৯
‘মুক্ত-মধ্যে কোন্ জীব মুক্ত
করি' মানি?”
‘কৃষ্ণপ্রেম
যাঁর, সেই মুক্ত-শিরোমণি
॥”
শ্রীচৈতন্য
মহাপ্রভু তখন তাকে জিজ্ঞাসা
করলেন, “সমস্ত মুক্তদের মধ্যে কোন্ জীব মুক্তশ্রেষ্ঠ?”
রামানন্দ রায় তখন উত্তর
দিলেন, “যিনি কৃষ্ণপ্রেম লাভ
করেছেন, মুক্ত-শিরোমণি ।” তিনিই
গান— রাধাকৃষ্ণের
প্রেমকেলি
চৈঃ
চঃ মধ্য ৮.২৫০
‘গান-মধ্যে কোন্ গান—জীবের নিজ ধর্ম?”
‘রাধাকৃষ্ণের
প্রেমকেলি' – যেই গীতের মর্ম
৷৷
শ্রীচৈতন্য
মহাপ্রভু তারপর রামানন্দ রায়কে জিজ্ঞাসা করলেন, “সমস্ত গানের মধ্যে কোন্ গান জীবের
প্রকৃত ধর্ম?” রামানন্দ রায় উত্তর দিলেন,
“যে গান রাধাকৃষ্ণের প্রেমকেলী
বর্ণনা করে, সেই গানই
সর্বশ্রেষ্ঠ। ”
শ্রেয়ঃ— কৃষ্ণভক্ত-সঙ্গ
চৈঃ
চঃ মধ্য ৮.২৫
‘শ্রেয়ো-মধ্যে কোন্ শ্রেয়ঃ জীবের হয় সার?”
‘কৃষ্ণভক্ত-সঙ্গ বিনা শ্রেয়ঃ
নাহি আর ॥ '
শ্রীচৈতন্য
মহাপ্রভু জিজ্ঞাসা করলেন, “সমস্ত মঙ্গলজনক এবং শুভকার্যের মধ্যে
কোনটি জীবের জন্য সর্বশ্রেষ্ঠ?” রামানন্দ
রায় উত্তর দিলেন, “জীবের একমাত্র শ্রেয় হচ্ছে কৃষ্ণভক্তের সঙ্গ করা, এছাড়া
আর কোন শ্রেয় নেই
।”
স্মরণ— কৃষ্ণনাম-গুণ-লীলা
চৈঃ
চঃ মধ্য ৮.২৫
‘কাঁহার
স্মরণ জীবন করিবে অনুক্ষণ?”
‘কৃষ্ণ’-নাম-গুণ-লীলা—প্রধান স্মরণ ॥’
শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু জিজ্ঞাসা করলেন, “জীব সর্বক্ষণ কার
কথা স্মরণ করবে?” রামানন্দ রায় উত্তর দিলেন,
“শ্রীকৃষ্ণের নাম, গুণ, লীলা
ইত্যাদি স্মরণ করাই সর্বশ্রেষ্ঠ।”
ধ্যেয়— রাধাকৃষ্ণপদাম্বুজ
চৈঃ
চঃ মধ্য ৮.২৫৩
‘ধ্যেয়-মধ্যে জীবের কর্তব্য কোন্ ধ্যান?”
‘রাধাকৃষ্ণপদাম্বুজ-ধ্যান—প্ৰধান ॥’
শ্রীচৈতন্য
মহাপ্রভু তখন তাকে জিজ্ঞাসা
করলেন, সব রকমের ধ্যানের
মধ্যে কিসের ধ্যান করা জীবের কর্তব্য?
শ্রীল রামানন্দ রায় উত্তর দিলেন,
“রাধাকৃষ্ণের শ্রীপাদপদ্মের ধ্যান করাই জীবের প্রধান
কর্তব্য।
বাসস্থান—ব্রজভূমি
চৈঃ
চঃ মধ্য ৮.258
‘সর্ব ত্যজি’ জীবের কর্তব্য কাহা বাস?”
‘ব্রজভূমি
বৃন্দাবন যাহা লীলারাস ॥’
শ্রীচৈতন্য
মহাপ্রভু জিজ্ঞাসা করলেন, “সবকিছু ত্যাগ করে কোথায় বাস
করা জীবের কর্তব্য?” রামানন্দ রায় উত্তর দিলেন,
“ব্রজভূমি বৃন্দাবনে যেখানে ভগবান তাঁর রাসলীলা-বিলাস
করেছিলেন।”
শ্রবণ—রাধাকৃষ্ণ-প্রেমকেলি
চৈঃ চঃ মধ্য ৮.২৫৫
‘শ্রবণমধ্যে জীবের কোন্ শ্রেষ্ঠ শ্রবণ?”
‘রাধাকৃষ্ণ-প্রেমকেলি কর্ণ-রসায়ন ॥’
“সমস্ত
শ্রবণীয় বিষয়ের মধ্যে কোন্ বিষয়টি জীবের
পক্ষে সর্বশ্রেষ্ঠ?” রামানন্দ রায় উত্তর দিলেন,
“রাধাকৃষ্ণের প্রেমকেলি শ্রবণই কর্ণের সবচাইতে আনন্দদায়ক বিষয়। ”
উপাস্য—রাধাকৃষ্ণ
চৈঃ
চঃ মধ্য ৮.২৫
‘উপাস্যের
মধ্যে কোন্ উপাস্য প্রধান?”
‘শ্রেষ্ঠ
উপাস্য—যুগল
‘রাধাকৃষ্ণ’ নাম
॥’
শ্রীচৈতন্য
মহাপ্রভু জিজ্ঞাসা করলেন, “সমস্ত উপাস্য বস্তুর মধ্যে কোন উপাস্য বস্তুটি
প্রধান?” রামানন্দ রায় উত্তর দিলেন,
‘রাধাকৃষ্ণ’ নাম,
‘হরেকৃষ্ণ মহামন্ত্র’ শ্রেষ্ঠ উপাস্য। ”
চৈঃ
চঃ মধ্য ৮.২৫৭
‘মুক্তি, ভুক্তি বাঞ্ছে যেই, কাহা দুহার গতি?”
‘স্থাবরদেহ, দেবদেহ যৈছে অবস্থিতি ॥'
শ্রীচৈতন্য
মহাপ্রভু জিজ্ঞাসা করলেন, “যারা মুক্তিলাভের বাসনা
করে এবং যারা ইন্দ্রিয়-সুখ ভোগ বাসনা
করে, তাদের কি গতি হয়?”
রামানন্দ রায় উত্তর দিলেন,
“যারা ব্রহ্মে লীন হয়ে যাওয়ার
সাযুজ্য মুক্তিলাভের চেষ্টা করে, তারা বৃক্ষ
আদি স্থাবর দেহ প্রাপ্ত হয়;
আর যারা ইন্দ্রিয়-সুখভোগের
বাসনা করে তারা দেবদেহ
প্রাপ্ত হয়।”
অরসজ্ঞ
জ্ঞানী এবং রসজ্ঞ ভক্তের
স্থিতি
চৈঃ চঃ মধ্য
৮.২৫৮ ২৫৯
অরসজ্ঞ কাক চুষে জ্ঞান-নিম্বফলে ৷
রসজ্ঞ কোকিল খায় প্ৰেমাম্ৰ-মুকুলে ৷৷
অভাগিয়া জ্ঞানী আস্বাদয়ে শুষ্ক জ্ঞান ।
কৃষ্ণ-প্রেমামৃত
পান করে ভাগ্যবান্ ॥
রামানন্দ
রায় বললেন, “মুক্তিকামী জ্ঞানীরা অরসজ্ঞ, তারা কর্কশ তর্কনিষ্ঠ
কাকের মতো; কাক যেমন
তিক্ত নিম্বফল খায়, তারাও তেমনই শুষ্ক নীরস জ্ঞানের চর্চা
করে। কিন্তু যারা রসজ্ঞ, তারা
কোকিলের মতো, তারা কৃষ্ণপ্রেমরূপ
আম্র-মুকুলের প্ৰিয় ও সুমিষ্ট রস
আস্বাদন করেন। রামানন্দ রায় বললেন, “দুর্ভাগা
জ্ঞানীরা শুষ্ক জ্ঞান আস্বাদন করে, আর কৃষ্ণভক্তরা
সর্বক্ষণ কৃষ্ণপ্রেমামৃত পান করেন ।
তাই তারা সব চাইতে
ভাগ্যবান।”
শ্রীল
রূপ গোস্বামী ও সনাতন গোস্বামীর
মহিমা
চৈঃ
চঃ মধ্য ১.৩২
ভক্তি
প্রচারিয়া সর্বতীৰ্থ প্ৰকাশিল ।
মদনগোপাল-গোবিন্দের সেবা প্রচারিল ।
বৃন্দাবনে
গিয়ে এই দুই ভাই
ভগবদ্ভক্তি প্রচার করেছিলেন এবং বহু লুপ্ত
তীর্থ উদ্ধার করেছিলেন । তাঁরা বিশেষভাবে
শ্ৰীশ্ৰীমদনমোহন শ্রীশ্রীগোবিন্দজীর সেবা প্রবর্তন ও
করেছিলেন।
চৈঃ
চঃ মধ্য ১.৩৩
নানা
শাস্ত্ৰ আনি' কৈলা ভক্তিগ্রন্থ
সার ।
মূঢ়
অধমজনেরে তিঁহো করিলা নিস্তার ॥
শ্রীল
রূপ গোস্বামী ও সনাতন গোস্বামী
বৃন্দাবনে বহু শাস্ত্র নিয়ে
এসেছিলেন এবং সেগুলির সার
সংগ্রহ করে ভগবদ্ভক্তি বিষয়ক
বহু শাস্ত্র প্রণয়ন করেছিলেন। এভাবেই তাঁরা সমস্ত মূর্খ ও অধঃপতিত মানুষদের
উদ্ধার করেছিলেন ।
চৈঃ
চঃ মধ্য ১.৩৪
প্রভু-আজ্ঞায় কৈল সব শাস্ত্রের বিচার।
ব্রজের নিগূঢ় ভক্তি করিল প্রচার ৷
শ্রীচৈতন্য
মহাপ্রভুর নির্দেশ অনুসারে সমস্ত শাস্ত্র বিচার করে তাঁরা ব্রজের
নিগূঢ় ভক্তি প্রচার করেছিলেন।
শ্রীল
কৃষ্ণদাস কবিরাজ গোস্বামী
শ্রীচৈতন্য
চরিতামৃতের গ্রন্থাকার হিসেবে শ্রীল কবিরাজ গোস্বামীর
গুণাবলী
যা তাঁর অধস্তন বৈষ্ণব
লেখকদের কাছে এক উজ্জ্বল
শিক্ষণীয় প্রেরণাস্বরূপ ।
বাগ্মিতা
চৈঃ
চঃ আদি ১.১০৫
বক্তব্য-বাহুল্য, গ্রন্থ-বিস্তারের ডরে।
বিস্তারে
না বর্ণি, সারার্থ কহি অল্পাক্ষরে ॥
গ্রন্থ-বিস্তারের ভয়ে আমি বিস্তারিতভাবে
বর্ণনা না করে, যথাসাধ্য
সংক্ষেপে তার সারার্থ বর্ণনা
করব ।
যুক্তি
ও বিচারপূর্বক উপস্থাপনা
চৈঃ
চঃ আদি ১.১০৮
১০৯
শ্রীচৈতন্য-নিত্যানন্দ-অদ্বৈত-মহত্ত্ব।
তাঁর
ভক্ত-ভক্তি-নাম প্রেম-রসতত্ত্ব
॥
ভিন্ন
ভিন্ন লিখিয়াছি করিয়া বিচার।
শুনিলে
জানিবে সব বস্তুতত্ত্বসার ৷৷
যদি
ধৈর্য সহকারে শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর মহিমা, শ্রীনিত্যানন্দ প্রভুর মহিমা, শ্রীঅদ্বৈত আচার্য প্রভুর মহিমা এবং তাঁদের ভক্ত,
নাম, যশ ও তাঁদের
প্রেমময়ী সম্পর্কের মাহাত্ম্য শ্রবণ করা হয়, তা
হলে সমস্ত তত্ত্ববস্তুর সার বিষয় হৃদয়ঙ্গম
করা যায় । তাই,
আমি যুক্তি ও বিচারপূর্বক এই
সমস্ত বিষয় (শ্রীচৈতন্য-চরিতামৃতে বর্ণনা করেছি।
বিনয়
চৈঃ চঃ আদি ৫.২০৫ ২০৬
জগাই মাধাই হৈতে মুঞি সে পাপিষ্ঠ ।
পুরীষের কীট হৈতে মুঞি সে লঘিষ্ঠ ৷৷
মোর নাম শুনে যেই তার পুণ্য ক্ষয় ।
মোর নাম
লয় যেই তার পাপ
হয় ॥
আমি
জগাই এবং মাধাই-এর
থেকেও বড় পাপী এবং
পুরীষের কীট থেকেও ঘৃণ্য
। যে আমার নাম
শোনে তার পুণ্য ক্ষয়
হয় । যে আমার
নাম উচ্চারণ করে তাঁর পাপ
হয় ।
চৈঃ
চঃ অন্ত্য ২০.৭৯-৮১
আকাশ—অনন্ত,
তাতে যৈছে পক্ষিগণ ৷
যার যত শক্তি, তত
করে আরোহণ ৷৷ ঐছে মহাপ্রভুর
লীলা—নাহি ওর-পার
৷ ‘জীব’ হঞা কেবা সম্যক্
পারে বর্ণিবার? যাবৎ বুদ্ধির গতি,
ততেক বৰ্ণিলঁ । সমুদ্রের মধ্যে
যেন এক কণ ছুঁইহুঁ
৷
চৈঃ চঃ আদি
১১.৫৭
অনন্ত নিত্যানন্দগণ—কে করু গণন ।
আত্মপবিত্রতা—হেতু লিখিলাঙ কত জন ৷৷
শ্রীনিত্যানন্দ
প্রভুর অনন্ত অনুগামী গণনা করে শেষ করা যায় না । আমি কেবল আত্ম-পবিত্রতার জন্য তাঁদের
কয়েকজনের কথা বর্ণনা করলাম ।
লেখরঙ্গে
চৈঃ চঃ আদি
৮.১
বন্দে চৈতন্যদেবং
তং ভগবন্তং যদিচ্ছয়া ।
প্রসভং নৰ্ততে
চিত্রং লেখরঙ্গে জড়োহপ্যয়ম্ ৷৷
যে ভগবান শ্রীচৈতন্যদেবের
ইচ্ছায় আমি মূর্খ এবং জড়বৎ হওয়া সত্ত্বেও হঠাৎ এই গ্রন্থ রচনারূপ নৃত্যকার্য আরম্ভ
করেছি, তাঁকে আমি বন্দনা করি৷
চৈঃ চঃ আদি
৮.৫
মুক কবিত্ব
করে যাঁ-সবার স্মরণে ।
পঙ্গু গিরি
লঙ্ঘে, অন্ধ দেখে তারাগণে ৷৷
পঞ্চতত্ত্বের
শ্রীপাদপদ্ম স্মরণ করে মূক কবিতে পরিণত হয়, পঙ্গু পর্বত লঙ্ঘন করে এবং অন্ধ আকাশে
তারকারাজি দর্শন করতে পারে ।
পূর্বতন আচার্য
এবং তাঁদের লেখনীর মহিমা কীর্তন
চৈঃ চঃ আদি
৮.৩৩
ওরে মূঢ় লোক,
শুন চৈতন্যমঙ্গল ।
চৈতন্য-মহিমা
যাতে জানিবে সকল ॥
হে মূর্খগণ!
চৈতন্যমঙ্গল পাঠ কর, এই গ্রন্থ পাঠ করলে শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর মহিমা জানতে পারবে ।
চৈঃ চঃ আদি
৮.৩৪
কৃষ্ণলীলা ভাগবতে কহে বেদব্যাস ।
চৈতন্য-লীলার ব্যাস—বৃন্দাবন-দাস ॥
ব্যাসদেব যেভাবে
শ্রীকৃষ্ণের সমস্ত লীলা শ্রীমদ্ভাগবতে বর্ণনা করেছেন, শ্রীল বৃন্দাবন দাস ঠাকুর ঠিক
সেভাবেই শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর লীলা বর্ণনা করেছেন ।
চৈঃ চঃ আদি
৮.৩৫
বৃন্দাবন-দাস
কৈল ‘চৈতন্যমঙ্গল' ।
যাঁহার শ্রবণে নাশে সব অমঙ্গল ৷৷
শ্রীল বৃন্দাবন
দাস ঠাকুর শ্রীচৈতন্য-মঙ্গল রচনা করেছেন । এই গ্রন্থ শ্রবণ করলে সব রকম অমঙ্গল নষ্ট
হয়ে যায় ।
চৈঃ চঃ আদি
৮.৩৬
চৈতন্য-নিতাইর
যাতে জানিয়ে মহিমা।
যাতে জানি কৃষ্ণভক্তিসিদ্ধান্তের
সীমা ॥
শ্রীচৈতন্য-মঙ্গল
পাঠ করলে শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর ও শ্রীনিত্যানন্দ প্রভুর মহিমা হৃদয়ঙ্গম করা যায় এবং
কৃষ্ণভক্তির চরম সিদ্ধান্তে উপনীত হওয়া যায় ৷
চৈঃ চঃ আদি
৮.৩৭
ভাগবতে যত ভক্তিসিদ্ধান্তের
সার।
লিখিয়াছেন ইহা জানি' করিয়া উদ্ধার ৷৷
শ্রীমদ্ভাগবতের
প্রামাণিক তত্ত্ব উল্লেখ করে শ্রীল বৃন্দাবন দাস ঠাকুর শ্রীচৈতন্য-মঙ্গলে (পরবর্তীকালে
শ্রীচৈতন্য-ভাগবত নামে পরিচিত) ভগবদ্ভক্তির সিদ্ধান্তের সারাংশ বর্ণনা করেছেন ।
চৈঃ চঃ আদি
৮.৩৮
‘চৈতন্যমঙ্গল' শুনে যদি পাষণ্ডী, যবন।
সেই মহাবৈষ্ণব
হয় ততক্ষণ ৷৷
মহাপাষণ্ডী
বা যবনও যদি শ্রীচৈতন্য-মঙ্গল শ্রবণ করেন, তা হলে তিনি এক মহাবৈষ্ণবে পরিণত হন ।
চৈঃ চঃ আদি
৮.৩৯
মনুষ্যে রচিতে
নারে ঐছে গ্রন্থ ধন্য ।
বৃন্দাবনদাস-মুখে বক্তা শ্রীচৈতন্য ৷৷
এই গ্রন্থের
বিষয়বস্তু এত গভীর যে, কোন মানুষের পক্ষে তা রচনা করা সম্ভব নয় । তাই মনে হয় যেন
শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু স্বয়ং শ্রীল বৃন্দাবন দাস ঠাকুরের মুখ দিয়ে কথাগুলি বলেছেন ।
চৈঃ চঃ মধ্য
১.১৩
চৈতন্যলীলার
ব্যাস—দাস বৃন্দাবন ৷
তাঁর আজ্ঞায়
করোঁ তাঁর উচ্ছিষ্ট চর্বণ ॥
শ্রীচৈতন্য
মহাপ্রভুর লীলা বর্ণনাকারী শ্রীল বৃন্দাবন দাস ঠাকুর হচ্ছেন শ্রীল ব্যাসদেবের অবতার
। তাঁরই আজ্ঞায় আমি কেবল তাঁর উচ্ছিষ্ট চর্বণ করছি।
চৈঃ চঃ অন্ত্য
২০.
চৈতন্য-লীলামৃত-সিন্ধু—দুগ্ধাক্কি-সমান ৷
তৃষ্ণানুরূপ
ঝারী ভরি' তেঁহো কৈলা পান৷৷
তাঁর ঝারী-শেষামৃত
কিছু মোরে দিলা ।
ততেকে ভরিল পেট, তৃষ্ণা মোর গেলা ।
শ্রীচৈতন্য
মহাপ্রভুর লীলামৃত-সিন্ধু ক্ষীর সমুদ্রের মতো । তাঁর তৃষ্ণা অনুসারে তাঁর ঝারী ভরে
শ্রীল বৃন্দাবন দাস ঠাকুর তা পান করেছেন । সেই ঝারীর অমৃতের কিছু অবশিষ্ট শ্রীল বৃন্দাবন
দাস ঠাকুর আমাকে দিয়েছেন, তাতেই আমার পেট ভরে গেছে এবং তৃষ্ণার নিবৃত্তি হয়েছে ।
সকল কৃতিত্ব
ভগবানে অৰ্পণ
চৈঃ চঃ আদি
৮.৭৮
এই গ্রন্থ লেখার
মোরে ‘মদনমোহন’।
আমার লিখন যেন শুকের পঠন ৷
প্রকৃতপক্ষে
শ্রীচৈতন্য-চরিতামৃত আমি লিখিনি, শ্রীমদনমোহন আমাকে দিয়ে তা লিখিয়েছিলেন । আমার লেখা
ঠিক শুক পক্ষীর (তোতা পাখির) পুনরাবৃত্তির মতো ।
বাহ্যিক প্রতিবন্ধকতা
অতিক্রম
চৈঃ চঃ মধ্য
২.৯০
আমি বৃদ্ধ জরাতুর,
লিখিতে কাঁপয়ে কর,
মনে কিছু স্মরণ
না হয় ৷
না দেখিয়ে নয়নে, না শুনিয়ে শ্রবণে,
তবু লিখি’— এ
বড় এ বড় বিস্ময়৷৷
আমি এখন অতি
বৃদ্ধ ও জরাতুর । লিখবার সময় আমার হাত কাঁপে । আমি কিছু স্মরণ রাখতে পারি না, চোখে
ভালমতো দেখতে পাই না আর কানেও ভালমতো শুনতে পাই না । তবুও আমি লিখি এবং তা হচ্ছে একটি
মস্ত বড় বিস্ময় ।
সকল ভক্তের
প্রতি সম্মান
চৈঃ চঃ মধ্য
২.৯৩
ছোট বড় ভক্তগণ,
বন্দোঁ সবার শ্রীচরণ,
সবে মোরে করহ
সন্তোষ ।
স্বরূপ-গোসাঞির
মত, রূপ-রঘুনাথ জানে যত,
তাই লিখি' নাহি
মোর দোষ ৷৷
আমি ছোট ও বড়
সমস্ত ভক্তদের শ্রীপাদপদ্ম বন্দনা করি । আমি তাঁদের সকলের কাছে সনির্বন্ধ অনুরোধ করি,
তাঁরা যেন আমার প্রতি প্রসন্ন হন । শ্রীস্বরূপ দামোদর গোস্বামী, শ্রীরূপ গোস্বামী ও
রঘুনাথ দাস গোস্বামীর কাছ থেকে আমি যা জেনেছি তারই বর্ণনা আমি এখানে লিপিবদ্ধ করেছি,
সুতরাং এই রচনায় কোন দোষ নেই । এখানে আমি কিছু যোগ কিরনি অথবা কিছু বাদও দিইনি ।
শ্রোতা বা পাঠকদের
চরণ-বন্দন
চৈঃ চঃ অন্ত্য
২০.১৫০
সব শ্রোতাগণের
করি চরণ-বন্দন ।
যাঁ-সবার চরণ-কৃপা—শুভের কারণ৷
আমি সমস্ত শ্রোতাদের
শ্রীপাদপদ্ম বন্দনা করি, কেননা তাঁদের শ্রীপাদপদ্মের কৃপাই সমস্ত শুভের কারণ ।
চৈঃ চঃ অন্ত্য
২০.১৫
চৈতন্যচরিতামৃত
যেই জন শুনে ।
তাঁর চরণ ধুঞা
করোঁ মুঞি পানে ৷৷
যেই জন শ্রীচৈতন্য
মহাপ্রভুর চরিতামৃত শ্রবণ করেন, তাঁর শ্রীপাদপদ্ম ধুয়ে আমি সেই জল পান করি।
চৈঃ চঃ অন্ত্য
২০.১৫
শ্রোতার পদরেণু
করোঁ মস্তক-ভূষণ ৷
তোমরা এ-অমৃত
পিলে সফল হৈল শ্ৰম ৷৷
সেই সমস্ত শ্রোতাদের
পদরেণু আমার মস্তকের ভূষণ । আপনারা এই অমৃত পান করলেন এবং তার ফলে আমার শ্রম সার্থক
হল ।
শ্রৌত-পন্থার
অনুগামী
চৈঃ চঃ অন্ত্য
১৭.
লিখ্যতে শ্রীল-গৌরেন্দোরত্যদ্ভুতমলৌকিকম্
।
যৈদৃষ্টং তন্মুখাচ্ছ্বত্বা দিব্যোন্মাদ-বিচেষ্টিতম৷৷
শ্রীচৈতন্য
মহাপ্রভুর অতি অদ্ভুত অলৌকিক দিব্য উন্মাদ চেষ্টা যাঁরা স্বচক্ষে দেখেন, তাঁদের মুখ
থেকে শ্রবণ করেই আমি তা লিখছি ।
কোন মন্তব্য নেই