অভিধেয় তত্ত্ব : ভক্তিই কৃষ্ণপ্রাপ্তির একমাত্র উপায়
অভিধেয় তত্ত্ব
ভক্তিই কৃষ্ণপ্রাপ্তির একমাত্র উপায়
চৈঃ চঃ মধ্য ২০.১৩৯
অতএব ‘ভক্তি’—কৃষ্ণপ্রাপ্ত্যের উপায় ।
‘অভিধেয়’ বলি' তারে সর্বশাস্ত্রে গায় ৷
অতএব ‘ভক্তি’ পরমেশ্বর ভগবান শ্রীকৃষ্ণকে লাভ করার একমাত্র উপায়। সমস্ত বৈদিক শাস্ত্রে তাই ভগবদ্ভক্তির পন্থাকে ‘অভিধেয়' বলে বর্ণনা করা হয়েছে। [সনাতন শিক্ষা]
ত্রিবিধ পন্থা
চৈঃ চঃ মধ্য ২০.১৫৭
জ্ঞান, যোগ, ভক্তি, –তিন সাধনের বশে ।
ব্রহ্ম, আত্মা, ভগবান্—ত্ৰিবিধ প্ৰকাশে ॥
পরম তত্ত্বকে জানার তিনটি পন্থা হচ্ছে জ্ঞান, যোগ এবং ভক্তি। এই তিনটি পন্থার মাধ্যমে পরম-তত্ত্ব যথাক্রমে ব্রহ্ম, পরমাত্মা এবং ভগবানরূপে উপলব্ধ হন । [সনাতন শিক্ষা]
পঞ্চাঙ্গ ভক্তি
চৈঃ চঃ মধ্য 25.558-559
সাধুসঙ্গ, নামকীর্তন, ভাগবত শ্রবণ ৷
মথুরাবাস, শ্রীমূর্তির শ্রদ্ধায় সেবন ৷৷
সকলসাধন-শ্রেষ্ঠ এই পঞ্চ অঙ্গ।
কৃষ্ণপ্রেম জন্মায় এই পাঁচের অল্প সঙ্গ ।।
ভক্তদের সঙ্গ করা, ভগবানের দিব্যনাম কীর্তন করা, শ্রীমদ্ভাগবত শ্রবণ করা, মথুরায় বাস করা এবং শ্রদ্ধা সহকারে ভগবানের শ্রীমূর্তির সেবা করা, এই পাঁচটি অঙ্গ সবকটি সাধনাঙ্গের মধ্যে শ্রেষ্ঠ । এই পাঁচের অল্প সংখ্যক প্রভাবেই কৃষ্ণপ্রেমের উদয় হয়। [সনাতন শিক্ষা]
চৈঃ চঃ মধ্য ২৪.১৯৩-১৯৪
সৎসঙ্গ, কৃষ্ণসেবা, ভাগবত, নাম ।
ব্ৰজে বাস, –এই পঞ্চ সাধন প্ৰধান ৷৷
এই পঞ্চ-মধ্যে এক ‘স্বল্প’ যদি হয় ।
সুবুদ্ধি জনের হয় কৃষ্ণপ্ৰেমোদয় ৷৷
কৃষ্ণভক্ত সঙ্গ, কৃষ্ণসেবা, শ্রীমদ্ভাগবত পাঠ, কৃষ্ণনাম কীর্তন
এবং কৃষ্ণধাম শ্রীব্রজে বাস—এই পাঁচটি প্রধান সাধন । কেউ যদি এই পাঁচটি সাধনের মধ্যে কোন একটি স্বল্পমাত্রায়ও সাধন করেন এবং তিনি যদি বুদ্ধিমান হন, তাহলে তাঁর সুপ্ত কৃষ্ণপ্রেম ধীরে ধীরে জাগরিত হয় । [সনাতন শিক্ষা]
নাম ও তুলসী সেবা
চৈঃ চঃ অন্ত্য ৩.১৩৭
নিরন্তর নাম লও, কর তুলসী সেবন ।
অচিরাৎ পাবে তবে কৃষ্ণের চরণ ॥
নিরন্তর ‘হরেকৃষ্ণ মহামন্ত্র' কীর্তন কর এবং তুলসীতে জল দান করে ও প্রার্থনা নিবেদন করে তাঁর সেবা কর । তাহলে অচিরেই তুমি শ্রীকৃষ্ণের শ্রীপাদপদ্মে আশ্রয় লাভ করবে । [বেশ্যার প্রতি হরিদাস ঠাকুর]
শাস্ত্র, তীর্থ, আচার, কৃষ্ণসেবা
চৈঃ চঃ মধ্য ২৩.১০৩-১০৪
তুমিহ করিহ ভক্তি-শাস্ত্রের প্রচার ।
মথুরায় লুপ্ততীর্থের করিহ উদ্ধার ॥
বৃন্দাবনে কৃষ্ণসেবা, বৈষ্ণব-আচার।
ভক্তিস্মৃতিশাস্ত্র করি' করিহ প্রচার ৷
হে সনাতন, তুমিও ভক্তিশাস্ত্রের প্রচার কর এবং মথুরায় লুপ্ত তীর্থের উদ্ধার কর । ভক্তি ও স্মৃতিশাস্ত্র প্রণয়ন করে বৃন্দাবনে কৃষ্ণসেবা এবং বৈষ্ণব আচার কর । [সনাতন শিক্ষায় সনাতন গোস্বামীর প্রতি মহাপ্রভুর আজ্ঞা]
গৌড়ীয় ভক্তদের প্রতি শ্রীগৌরের নির্দেশ
চৈঃ চঃ মধ্য ৩.১৯০
ঘরে যাঞা কর সদা কৃষ্ণসংকীর্তন ৷
কৃষ্ণনাম, কৃষ্ণকথা, কৃষ্ণ আরাধন ৷৷
তোমরা সকলে ঘরে ফিরে গিয়ে সমবেতভাবে শ্রীকৃষ্ণের দিব্যনাম কীর্তন কর, সর্বক্ষণ কৃষ্ণকথা আলোচনা কর এবং শ্রীকৃষ্ণের আরাধনা কর।
[সন্ন্যাসান্তে শান্তিপুর থেকে পুরীগমনকালে শান্তিপুরে আগত নবদ্বীপবাসীর প্রতি মহাপ্রভুর নির্দেশ]
কৃষ্ণ ও বৈষ্ণব সেবা এবং নিরন্তর নাম-সংকীর্তন
চৈঃ চঃ মধ্য ১৫.১08
প্রভু কহেন,— ‘কৃষ্ণসেবা”, ‘বৈষ্ণব-সেবন' ।
‘নিরন্তর কর কৃষ্ণনাম-সংকীৰ্তন' ৷৷
শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু উত্তর দিলেন, “কৃষ্ণসেবা কর, বৈষ্ণবদের সেবা কর, এবং নিরন্তর কৃষ্ণনাম সংকীর্তন কর ।” [সত্যরাজ খানের প্রতি মহাপ্রভু
চৈঃ চঃ মধ্য ১৬.90
প্রভু কহে,—“বৈষ্ণব-সেবা, নাম-সংকীর্তন।
দুই কর, শীঘ্র পাবে শ্রীকৃষ্ণ-চরণ ৷৷
শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু বললেন, “তুমি বৈষ্ণবদের সেবা কর এবং নিরন্তর কৃষ্ণনাম কীর্তন কর; এই দুটি কার্য করলে অচিরেই শ্রীকৃষ্ণের শ্রীপাদপদ্মে আশ্রয় লাভ করবে [কুলিন গ্রামের অধিবাসীদের প্রতি মহাপ্রভু ]
ভক্তিরস-সিন্ধু
চৈঃ চঃ মধ্য ১৯.১৩৭
পারাপার-শূন্য গভীর ভক্তিরস-সিন্ধু।
তোমায় চাখাইতে তার কহি এক ‘বিন্দু’ ॥
ভক্তিরসের সমুদ্র পারাপার-শূন্য এবং গভীর । তার এক বিন্দু আমি তোমাকে আস্বাদন করাতে চাই ।
ভক্তিযোগের শ্রেষ্ঠত্ব
মোক্ষবাঞ্ছা—কৈতব প্ৰধান
চৈঃ চঃ আদি ১.৯০,৯২
অজ্ঞান-তমের নাম কহিয়ে ‘কৈতব’।
ধর্ম-অর্থ-কাম-মোক্ষ-বাঞ্ছা আদি সব ৷৷
তার মধ্যে মোক্ষবাঞ্ছা কৈতব প্রধান ৷
যাহা হৈতে কৃষ্ণভক্তি হয় অন্তর্ধান ।
অজ্ঞানতার অন্ধকারকে বলা হয় কৈতব বা প্রতারণা পন্থা, যা শুরু হয় ধর্ম, অর্থ, কাম ও মোক্ষ আদির মাধ্যমে । ধর্ম, অর্থ, কাম ও মোক্ষ আদি কৈতব ধর্মগুলির মধ্যে ব্রহ্মে লীন হয়ে যাওয়ার মোক্ষবাসনা হচ্ছে সব চাইতে আত্মপ্রবঞ্চনা, কেননা তার ফলে কৃষ্ণভক্তি চিরতরে অন্তর্হিত হয়ে যায় ।
কৃষ্ণনামানন্দ এবং ব্রহ্মানন্দ
চৈঃ চঃ আদি ৭.৯৭
কৃষ্ণনামে যে আনন্দসিন্ধু-আস্বাদন ।
ব্রহ্মানন্দ তার আগে খাতোদক-সম ৷৷
হরে কৃষ্ণ মহামন্ত্র কীর্তন করার ফলে যে আনন্দামৃত-সিন্ধু আস্বাদন করা যায়, তার তুলনায় ব্রহ্মানন্দ হচ্ছে অগভীর খাদের জলের মতো ।
কৃষ্ণকে বশ করার একমাত্র উপায়
চৈঃ চঃ আদি ১৭.৭৫
জ্ঞান-কর্ম-যোগ-ধর্মে নহে কৃষ্ণ বশ ।
কৃষ্ণবশ-হেতু এক—প্রেমভক্তি-রস ॥ ৷৷
দার্শনিক জ্ঞান, সকাম কর্ম, অষ্টাঙ্গযোগ আদির দ্বারা ভগবান শ্রীকৃষ্ণকে সন্তুষ্ট করা যায় না। প্রেমভক্তিই হচ্ছে শ্রীকৃষ্ণকে সন্তুষ্ট করার একমাত্র উপায় ।
চৈঃ চঃ মধ্য 0.136
ঐছে শাস্ত্ৰ কহে,—কর্ম, জ্ঞান, যোগ ত্যজি'।
‘ভক্ত্যে কৃষ্ণ বশ হয়, ভক্ত্যে তাঁরে ভজি ৷
কর্ম, জ্ঞান এবং যোগের পন্থা পরিত্যাগ করে ভক্তির মাধ্যমে ভগবানের ভজনা করার জন্য বৈদিক শাস্ত্রে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে । ভক্তির দ্বারাই কেবল ভগবান পূর্ণরূপে সন্তুষ্ট হন । [সনাতন শিক্ষা]
অভক্তের প্রাপ্তি কেবল দণ্ড
চৈঃ চঃ মধ্য ৬.২৬৩
ভট্টাচার্য কহে—‘ভক্তি'-সম নহে মুক্তি-ফল।
ভগবদ্ভক্তিবিমুখের হয় দণ্ড কেবল ৷
সার্বভৌম ভট্টাচার্য উত্তর দিলেন—“মুক্তির ফল ভক্তির সমতুল্য নয় । যারা ভগবদ্ভক্তি বিমুখ তারা কেবল দণ্ডই ভোগ করে ।” [মহাপ্রভুর প্রতি সার্বভৌম ভট্টাচার্য ]
মুক্তি—নরকের সমতুল্য
চৈঃ চঃ মধ্য ৯.২৬৭
পঞ্চবিধ মুক্তি ত্যাগ করে ভক্তগণ ।
ফল্গু করি’ ‘মুক্তি' দেখে নরকের সম ॥
শুদ্ধভক্তরা পঞ্চবিধ মুক্তি পরিত্যাগ করেন; প্রকৃতপক্ষে, তাদের কাছে মুক্তি অত্যন্ত তুচ্ছ কেননা তারা মুক্তিকে নরকের মতো বলে মনে করেন। [উড়ুপীতে তত্ত্ববাদীদের প্রতি মহাপ্রভু]
কৃষ্ণভক্তি বিনা অন্যান্য পন্থা তাদের বাঞ্চিত ফল প্রদান করতে পারে না
চৈঃ চঃ মধ্য ২২.১৭-১৮
কৃষ্ণভক্তি হয় অভিধেয়-প্ৰধান ৷
ভক্তিমুখ-নিরীক্ষক কৰ্ম-যোগ-জ্ঞান ৷৷
এই সব সাধনের অতি তুচ্ছ বল ৷
কৃষ্ণভক্তি বিনা তাহা দিতে নারে ফল ॥
ভগবদ্ভক্তি জীবের মুখ্য বৃত্তি । কর্ম, জ্ঞান, যোগ আদি মুক্তিরবিভিন্ন পন্থা রয়েছে, কিন্তু তারা সকলেই ভক্তির উপর নির্ভরশীল। এই সমস্ত পন্থার সাধনের বল অত্যন্ত তুচ্ছ, কৃষ্ণভক্তি বিনা তারা বাঞ্ছিত ফল প্রদান করতে পারে না । [সনাতন শিক্ষা]
ভক্তি ব্যতীত জ্ঞান একাকী মুক্তি দিতে পারে না
চৈঃ চঃ মধ্য ২২.
কেবল জ্ঞান ‘মুক্তি’ দিতে নারে ভক্তি বিনে।
কৃষ্ণোন্মুখে সেই মুক্তি হয় বিনা জ্ঞানে ৷৷
ভক্তি বিনা কেবল জ্ঞান মুক্তি দিতে পারে না, কিন্তু কৃষ্ণোন্মুখ হলে জ্ঞান বিনা সেই মুক্তি লাভ হয় । সনাতন শিক্ষা]
বুদ্ধিমান ব্যক্তি অবশ্যই ভক্তিযোগ গ্রহণ করবেন
চৈঃ চঃ মধ্য ২২.৩৫
ভুক্তি-মুক্তি-সিদ্ধিকামী ‘সুবুদ্ধি’ যদি হয় ৷
গাঢ়-ভক্তিযোগে তবে কৃষ্ণেরে ভজয় ৷৷
অসৎ সঙ্গের প্রভাবে, জীব জড়ভোগ, মুক্তি বা ব্রহ্ম সাযুজ্য, অথবা যোগ সিদ্ধি কামনা করে । যদি কোন সৎসঙ্গে তার সুবুদ্ধির উদয় হয়, তবে ভুক্তি-মুক্তি-সিদ্ধি-পিপাসা পরিত্যাগ করে সে গাঢ় শুদ্ধভক্তি সহকারে কৃষ্ণকে ভজন করে । [সনাতন শিক্ষা]
পূর্ণ পন্থা—পূর্ণ ফল
চৈঃ চঃ মধ্য ২০.168
‘ভক্ত্যে’ ভগবানের অনুভব—পূর্ণরূপ ।
একই বিগ্রহে তাঁর অনন্ত স্বরূপ ৷
ভক্তির মাধ্যমেই কেবল সর্বতোভাবে পূর্ণ ভগবানের রূপ অনুভব করা যায় । যদিও তাঁর বিগ্রহ এক, কিন্তু তিনি অনন্ত স্বরূপে প্রকাশিত হন । [সনাতন শিক্ষা]
ভক্তিবিহীন বর্ণাশ্রমের অসারত্ব
চৈঃ চঃ মধ্য ২২.56
চারি বর্ণাশ্রমী যদি কৃষ্ণ নাহি ভজে ।
স্বকর্ম করিতে সে রৌরবে পড়ি' মজে ৷
বর্ণাশ্রম ধর্মের অনুগামীরা যদি শ্রীকৃষ্ণের ভজনা না করে, তাহলে তারা তাদের স্বকর্মের ফলে রৌরব নামক নরকে নিমজ্জিত হয় । [সনাতন শিক্ষা]
ভক্তি ব্যতীত বুদ্ধির শুদ্ধি সম্ভব নয়
চৈঃ চঃ মধ্য ২২.29
জ্ঞানী জীবন্মুক্তদশা পাইনু করি' মানে ৷
বস্তুতঃ বুদ্ধি ‘শুদ্ধ’ নহে কৃষ্ণভক্তি বিনে ॥
মায়াবাদ প্রভৃতি মতাবলম্বী ব্যক্তিরা নিজেদের জ্ঞানী বলে মনে করে, এবং তারা মনে করে যে তারা জীবন্মুক্ত হয়ে গেছে । কিন্তু প্রকৃতপক্ষে কৃষ্ণভক্তি ব্যতীত বুদ্ধি কখনও শুদ্ধ হয় না । [সনাতন শিক্ষা]
চৈঃ চঃ অন্ত্য ৩.১৯৬
ভক্তিযোগের সম্মুখে মুক্তির তুচ্ছতা
ভক্তিসুখ-আগে ‘মুক্তি' অতি-তুচ্ছ হয়।
অতএব ভক্তগণ ‘মুক্তি' নাহি লয় ৷
ভগবদ্ভক্তির আনন্দের কাছে মুক্তির আনন্দ অত্যন্ত তুচ্ছ, তাই শুদ্ধ ভক্তরা কখনই মুক্তি লাভের বাসনা করেন না । [হিরণ্য এবং গোবর্ধন মজুমদারের সভায় গোপাল চক্রবর্তীর প্রতি হরিদাস ঠাকুর]
ভক্তিযোগের মহিমা
কল্মষ কি ?
চৈঃ চঃ আদি ৩.৬১
ভক্তির বিরোধী কর্ম-ধর্ম বা অধর্ম ।
তাহার ‘কল্মষ' নাম, সেই মহাতমঃ ॥
ভক্তিবিরোধী যে কর্ম, তা ধর্মই হোক অথবা অধর্মই হোক, তা হচ্ছে ঘোর তমসাচ্ছন্ন। তাকে বলা হয় ‘কল্মষ' ।
চৈঃ চঃ আদি ১.৯৪
কৃষ্ণভক্তির বাধক—যত শুভাশুভ কর্ম ।
সেহ এক জীবের অজ্ঞানতমো ধর্ম ৷৷
কৃষ্ণভক্তির প্রতিবন্ধক যে সমস্ত কর্ম, তা শুভই হোক অথবা অশুভই হোক, সেই সমস্ত জীবের তমোগুণজাত অজ্ঞানতা ছাড়া আর কিছু নয় ।
ভক্তিতে প্রগতি মাপক
চৈঃ চঃ আদি ৭.১৪৩
কৃষ্ণের চরণে হয় যদি অনুরাগ ।
কৃষ্ণ বিনু অন্যত্র তার নাহি রহে রাগ ॥
কেউ যদি শ্রীকৃষ্ণের প্রতি প্রীতি-পরায়ণ হয়ে তাঁর শ্রীপাদপদ্মের প্রতি অনুরক্ত হন, তা হলে ধীরে ধীরে অন্য সব কিছুর প্রতি তাঁর আসক্তি নষ্ট হয়ে যাবে ।
প্রগাঢ় প্রেমের স্বভাব
চৈঃ চঃ মধ্য ৪.১৮৬
প্রগাঢ়-প্রেমের এই স্বভাব-আচার ।
নিজ-দুঃখ-বিঘ্নাদির না করে বিচার ৷
প্রগাঢ় কৃষ্ণপ্রেমের স্বাভাবিক আচরণই এই রকম যে, ভক্ত তাঁর ব্যক্তিগত দুঃখ অথবা বাধাবিঘ্নের বিচার করেন না । সর্ব অবস্থাতেই তিনি কেবল পরমেশ্বর ভগবান শ্রীকৃষ্ণের সেবা করতে চান ।
শ্রদ্ধা শব্দের অর্থ
চৈঃ চঃ মধ্য ২২.৬
‘শ্রদ্ধা’-শব্দে—বিশ্বাস কহে সুদৃঢ় নিশ্চয় ৷
কৃষ্ণে ভক্তি কৈলে সর্বকৰ্ম কৃত হয় ৷৷
কৃষ্ণভক্তি সম্পাদিত হলে অন্য সমস্ত কর্ম আপনা থেকে করা হয়ে যায়; এই সুদৃঢ় বিশ্বাসকে বলা হয় শ্রদ্ধা । [সনাতন শিক্ষা]
সকল ঋণ পরিশোধ
চৈঃ চঃ মধ্য ২২.১80
কাম ত্যজি' কৃষ্ণ ভজে শাস্ত্র-আজ্ঞা মানি'।
দেব-ঋষি-পিত্রাদিকের কভু নহে ঋণী ॥
সমস্ত জড় কামনা বাসনা পরিত্যাগ করে যখন শাস্ত্রের নির্দেশ অনুসারে শ্রীকৃষ্ণের ভজনা করেন, তখন তিনি আর দেবতা, ঋষি, পিতৃপুরুষ আদি কারোর কাছে ঋণী থাকেন না । [সনাতন শিক্ষা]
এমনকি আকস্মিক পতনেও কৃষ্ণ তাঁর ভক্তে শুদ্ধ করেন
চৈঃ চঃ মধ্য ২.183
অজ্ঞানে বা হয় যদি ‘পাপ’ উপস্থিত।
কৃষ্ণ তাঁরে শুদ্ধ করে, না করায় প্রায়শ্চিত্ত ৷৷
কিন্তু ভক্ত যদি অজ্ঞানতাবশত কোন পাপকর্ম করে থাকেন, তাহলে শ্রীকৃষ্ণ তাকে সেই পাপ থেকে মুক্ত করেন । ভগবান ভক্তকে পাপের জন্য প্রায়শ্চিত্ত করান না। [সনাতন শিক্ষা]
প্রেমই কৃষ্ণ প্রাপ্তির একমাত্র উপায়
চৈঃ চঃ অন্ত্য ৪.৫৮
‘ভক্তি’ বিনা কৃষ্ণে কভু নহে ‘প্ৰেমোদয়’।
প্রেম বিনা কৃষ্ণপ্রাপ্তি অন্য হৈতে নয় ৷
ভক্তি ব্যতীত কখনই হৃদয়ে কৃষ্ণ-প্রেমের উদয় হয় না; এবং প্রেম ব্যতীত কখনই শ্রীকৃষ্ণকে পাওয়া যায় না। [জগন্নাথের রথে দেহ ত্যাগের পরিকল্পনা নিয়ে সনাতন
গোস্বামী জগন্নাথ পুরীতে এলে একদিন হঠাৎ মহাপ্রভু সনাতন গোস্বামীকে বলতে লাগলেন, কেবল ভক্তিই হচ্ছে কৃষ্ণ প্রাপ্তির উপায়, দেহত্যাগ নয়...]
কৃষ্ণভজনের যোগ্যতা কি ?
চৈঃ চঃ অন্ত্য ৪.৬৬
নীচ জাতি নহে কৃষ্ণভজনে অযোগ্য।
সৎকুল-বিপ্ৰ নহে ভজনের যোগ্য ৷৷
নীচ জাতি কৃষ্ণ-ভজনের, অযোগ্য নয়, আবার সৎ কুলোদ্ভুত ব্রাহ্মণও ভজনের যোগ্য নয় । [সনাতন গোস্বামীর প্রতি মহাপ্রভু]
কে বড় ভক্ত ?
চৈঃ চঃ অন্ত্য ৪.৬৭
যেই ভজে সেই বড়, অভক্ত—হীন, ছার।
কৃষ্ণভজনে নাহি জাতি-কুলাদি-বিচার ৷৷
যিনি শ্রীকৃষ্ণের ভজনা করেন, তিনিই মহান, আর যারা অভক্ত তারা অধঃপতিত এবং ঘৃণ্য । তাই কৃষ্ণভজনে জাতি, কুল ইত্যাদির কোন বিচার নেই । [সনাতন গোস্বামীর প্রতি মহাপ্রভু]
ভগবানের দয়া লাভের যোগ্য কে ?
চৈঃ চঃ অন্ত্য ৪.৬৮
দীনেরে অধিক দয়া করেন ভগবান্ ।
কুলীন, পণ্ডিত, ধনীর বড় অভিমান ৷৷
পরমেশ্বর ভগবান শ্রীকৃষ্ণ সর্বদা দীন ব্যক্তিদের অধিক কৃপা করেন, কিন্তু কুলীন, পণ্ডিত এবং ধনী ব্যক্তিরা অত্যন্ত দাম্ভিক । [সনাতন গোস্বামীর প্রতি মহাপ্রভু]
নাম সংকীর্তন
‘কৃষ্ণ’ নাম উচ্চারণের প্রভাব
চৈঃ চঃ অন্ত্য ১.৯৯ ও বিদগ্ধ মাধব ১.১৫
তুণ্ডে তাণ্ডবিনী রতিং বিতনুতে তুণ্ডাবলীলব্ধয়ে
কর্ণক্রোড়কড়ম্বিনী ঘটয়তে কর্ণার্বুদেভ্যঃ স্পৃহাম্ ।
চেতঃপ্রাঙ্গণসঙ্গিনী বিজয়তে সর্বেন্দ্রিয়াণাং কৃতিং
নো জানে জনিতা কিয়দ্ভিরমূতৈঃ কৃষ্ণেতি বর্ণদ্বয়ী ৷৷
‘কৃষ্ণ’ এই বর্ণ দুটি যে কত অমৃতের দ্বারা উৎপন্ন হয়েছে, তা আমি জানি না । যখন এই নাম উচ্চারণ করা হয়, তখন মনে হয় তা যেন মুখে নৃত্য করছে । তখন বহু মুখ পাওয়ার ইচ্ছা হয় । সেই নাম যখন কর্ণকুহরে প্রবেশ করে, তখন লক্ষ লক্ষ কর্ণ লাভ করার স্পৃহা জন্মায়; এবং যখন এই দিব্যনাম চিত্ত প্রাঙ্গণে (সঙ্গিনী রূপে) উদিত হয়, তখন সমস্ত ইন্দ্রিয়ের ক্রিয়াকে পরাজিত করে, এবং তাই তখন ইন্দ্রিয়ের সমস্ত ক্রিয়া স্তব্ধ হয় ।
সর্বশ্রেষ্ঠ পন্থা
চৈঃ চঃ অন্ত্য ৪.৭০-৭১
ভজনের মধ্যে শ্রেষ্ঠ নববিধা ভক্তি ।
‘কৃষ্ণপ্রেম’, ‘কৃষ্ণ’ দিতে ধরে মহাশক্তি ॥
তার মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ নাম-সঙ্কীর্তন ।
নিরপরাধে নাম লৈলে পায় প্ৰেমধন ॥
ভগবদ্ভজনে ভক্তি অনুশীলনের ন'টি পন্থা শ্রেষ্ঠ, কেননা এই পন্থাগুলি ‘কৃষ্ণপ্রেম' ও ‘কৃষ্ণ’ দিতে মহাশক্তি ধরে। ভগবদ্ভক্তি অনুশীলনের সমস্ত পন্থার মধ্যে ভগবানের নাম-সংকীর্তন সর্বশ্রেষ্ঠ । দশটি অপরাধ বর্জন করে কেউ যদি ভগবানের নাম-সংকীর্তন করেন, তাহলে তিনি অনায়াসে সবচাইতে দুর্লভ ভগবৎ-প্রেম লাভ করেন। [সনাতন গোস্বামীর প্রতি মহাপ্রভু]
নাম হতেই নববিধা ভক্তির পূর্ণতা
'চৈঃ চঃ মধ্য ১৫.১09
“এক কৃষ্ণনামে করে সর্ব-পাপ ক্ষয়।
নববিধা ভক্তি পূর্ণ নাম হৈতে হয় ৷৷
কেবলমাত্র কৃষ্ণনামে সমস্ত পাপ ক্ষয় হয় । কেবলমাত্র ভগবানের দিব্যনাম কীর্তন করার ফলে নববিধা ভক্তি পূর্ণ হয়।
নামে সবার অধিকার
চৈঃ চঃ আদি ১৭-১
বন্দে স্বৈরাদ্রুতেহং তং চৈতন্যং যৎপ্রসাদতঃ ।
যবনাঃ সুমনায়ন্তে কৃষ্ণনামপ্ৰজল্পকাঃ ৷৷
যাঁর প্রসাদে যবনেরা সচ্চরিত্র হয়ে কৃষ্ণনাম জপ করে, সেই সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র অলৌকিক লীলাপরায়ণ শ্রীচৈতন্যদেবকে আমি বন্দনা করি ।
ভগবানের আবির্ভাবের উদ্দেশ্য
চৈঃ চঃ আদি ৩.৪০
কলিযুগে যুগধর্ম—নামের প্রচার ৷
তথি লাগি' পীতবর্ণ চৈতন্যাবতার ৷
কলিযুগের যুগধর্ম হচ্ছে ভগবানের নামের মহিমা প্রচার । সেই উদ্দেশ্য সাধন করার জন্য ভগবান পীতবর্ণ ধারণ করে শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুরূপে আবির্ভূত হয়েছেন ।
কলি-যুগে সার ধর্ম
চৈঃ চঃ আদি ৩.৫০
ব্যক্ত করি' ভাগবতে কহে বার বার ।
কলিযুগে ধর্ম—নাম-সঙ্কীর্তন সার ।।
শ্রীমদ্ভাগবতে বারবার স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে যে, কলিযুগে সমস্ত ধর্মের সার হচ্ছে ভগবান শ্রীকৃষ্ণের নাম-সংকীর্তন ।
চৈঃ চঃ মধ্য ২০.৩83
আর তিনযুগে ধ্যানাদিতে যেই ফল হয়।
কলিযুগে কৃষ্ণনামে সেই ফল পায় ৷৷
অন্য তিন যুগে—সত্য, ত্রেতা এবং দ্বাপরে—যথাক্রমে ধ্যান, যজ্ঞ, অর্চন করে যে ফল লাভ হয়, কলিযুগে কেবল ‘হরেকৃষ্ণ মহামন্ত্র' কীর্তন করার ফলে সেই ফল লাভ হয় ।
সমস্ত শাস্ত্রের মর্মকথা
চৈঃ চঃ মধ্য ৯.৩৬
এই কলিকালে আর নাহি কোন ধর্ম ।
বৈষ্ণব, বৈষ্ণবশাস্ত্র, এই কহে মৰ্ম ৷
বৈষ্ণব এবং বৈষ্ণব-শাস্ত্রের অনুগমন করা ছাড়া কলিকালে আর কোন ধর্ম নেই । সমস্ত শাস্ত্রের এইটিই হচ্ছে মর্মকথা ।
সর্বশ্রেষ্ঠ যজ্ঞ
চৈঃ চঃ আদি ৩.৭৮
সেই ত' সুমেধা, আর কুবুদ্ধি সংসার ।
সর্ব-যজ্ঞ হৈতে কৃষ্ণনামযজ্ঞ সার ৷৷
সেই মানুষই হচ্ছেন যথার্থ বুদ্ধিমান । কিন্তু যারা নির্বোধ, তারা সংসারে জন্ম-মৃত্যুর আবর্তে নিরন্তর আবর্তিত হয় । সমস্ত যজ্ঞের মধ্যে পরমেশ্বর ভগবানের দিব্য নাম-কীর্তনই হচ্ছে সর্বশ্রেষ্ঠ যজ্ঞ।
হরিনামকে অশ্বমেধাদি যজ্ঞের সমতুল্য মনে করা পাষণ্ডের কার্য
চৈঃ চঃ আদি ৩.৭৯
কোটি অশ্বমেধ এক কৃষ্ণ নাম সম ৷
যেই কহে, সে পাষণ্ডী, দণ্ডে তারে যম ॥
কোটি অশ্বমেধ যজ্ঞ এক কৃষ্ণনামের সমান, এই কথা যে বলে সে পাষণ্ডী । সে অবশ্যই যমরাজ কর্তৃক দণ্ডিত হবে ।
সর্বমন্ত্রসার
চৈঃ চঃ আদি ৭.৭২-98
মূর্খ তুমি, তোমার নাহিক বেদান্তাধিকার ।
‘কৃষ্ণমন্ত্ৰ’ ‘জপ’ সদা, এই মন্ত্রসার ॥
কৃষ্ণ-মন্ত্ৰ হৈতে হবে সংসার মোচন ৷
কৃষ্ণ-নাম হৈতে পাবে কৃষ্ণের চরণ ৷৷
নাম বিনা কলিকালে নাহি আর ধর্ম ।
সর্বমন্ত্রসার নাম, এই শাস্ত্ৰমৰ্ম ৷৷
তিনি বলেছিলেন, ‘তুমি একটি মূর্খ, বেদান্ত দর্শন অধ্যয়ন করার অধিকার তোমার নেই, তুমি কেবল নিরন্তর কৃষ্ণনাম জপ কর। এটিই হচ্ছে সমস্ত বৈদিক মন্ত্রের সার । কেবলমাত্র শ্রীকৃষ্ণের দিব্যনাম জপ করার ফলে জড় জগতের বন্ধন থেকে মুক্ত হওয়া যায় । হরে কৃষ্ণ মহামন্ত্র কীর্তন করার ফলেই কেবল শ্রীকৃষ্ণের শ্রীপাদপদ্মের দর্শন লাভ করা যায়। এই কলিযুগে ভগবানের
দিব্যনাম কীর্তন করা ছাড়া আর কোন ধর্ম নেই । এই নাম হচ্ছে সমস্ত বৈদিক মন্ত্রের সার । এটিই সমস্ত শাস্ত্রের মর্ম । [প্রকাশানন্দের প্রশ্নের উত্তরে মহাপ্রভু তাঁর প্রতি স্বীয় গুরুদেবের নির্দেশ উদ্ধৃত করছেন]
হরেকৃষ্ণ মহামন্ত্রের স্বভাব
চৈঃ চঃ আদি ৭.৮১,৮৩
কিবা মন্ত্ৰ দিলা, গোসাঞি, কিবা তার বল ।
জপিতে জপিতে মন্ত্র করিল পাগল ॥
কৃষ্ণনাম-মহামন্ত্রের এই ত' স্বভাব ।
যেই জপে, তার কৃষ্ণ উপজয়ে ভাব ৷
হে প্রভু আপনি আমাকে কি মন্ত্র দিয়েছেন? অদ্ভুত তার প্রভাব! সেই মন্ত্র জপ করতে করতে আমি পাগল হয়ে গেলাম । ‘হরে কৃষ্ণ মহামন্ত্রের এটিই হচ্ছে স্বভাব, যে তা জপ করে, তারই তৎক্ষণাৎ শ্রীকৃষ্ণের প্রতি প্রেমময়ী ভক্তিভাবের উদয় হয় । [ঈশ্বর-পুরীর প্রতি মহাপ্রভুর প্রশ্ন এবং ঈশ্বর পুরীর উত্তর]
নামের আচার ও প্রচার
চৈঃ চঃ আদি ৭.৯২
নাচ, গাও, ভক্তসঙ্গে কর সংকীর্তন।
কৃষ্ণনাম উপদেশি' তার' সর্বজন ৷৷
বৎস! নাচ, গাও এবং ভক্তসঙ্গে সংকীর্তন কর । তা ছাড়া, তুমি কৃষ্ণনাম সংকীর্তন করার মহিমা সম্পর্কে সকলকে উপদেশ দাও, কেননা এভাবেই তুমি সমস্ত অধঃপতিত জীবদের উদ্ধার করতে পারবে।
[ঈশ্বর-পুরী কর্তৃক মহাপ্রভুর প্রশ্নের প্রত্যুত্তর]
নামানন্দ বনাম ব্ৰহ্মানন্দ
চৈঃ চঃ আদি ৭.৯৭
কৃষ্ণনামে যে আনন্দসিন্ধু-আস্বাদন ।
ব্রহ্মানন্দ তার আগে খাতোদক-সম ৷৷
হরে কৃষ্ণ মহামন্ত্র কীর্তন করার ফলে যে আনন্দামৃত-সিন্ধু আস্বাদন করা যায়, তার তুলানায় ব্রহ্মানন্দ হচ্ছে অগভীর খাদের জলের মতো ।
বহু জন্ম ধরেও অপরাধযুক্ত নাম গ্রহণে প্রেম লাভ হয় না
চৈঃ চঃ আদি ৮.১৬
বহু জন্ম করে যদি শ্রবণ, কীর্তন ৷
তবু ত' না পায় কৃষ্ণপদে প্ৰেমধন ॥
দশবিধ নাম-অপরাধযুক্ত ব্যক্তি যদি বহুজন্ম শ্রবণ ও কীর্তন করেন, তবুও কৃষ্ণপদে প্রেমধন লাভ করেন না ।
নিরপরাধে এক কৃষ্ণনামই সর্বপাপ নাশে সমর্থ
চৈঃ চঃ আদি ৮.২৬
‘এক’ কৃষ্ণনামে করে সর্বপাপ নাশ ।
প্রেমের কারণ ভক্তি করেন প্রকাশ ৷৷
নিরপরাধে হরে কৃষ্ণ মহামন্ত্র কীর্তন করার ফলে সমস্ত পাপ বিনষ্ট হয় । তার ফলে ভগবদ্ভক্তি যা প্রেমের কারণ, তা প্রকাশিত হয়।
হরিনামই কলিকালে কৃষ্ণ-অবতার
চৈঃ চঃ আদি ১৭.২5
কলিকালে নামরূপে কৃষ্ণ-অবতার ।
নাম হৈতে হয় সর্বজগৎ-নিস্তার ৷
এই কলিযুগে, ভগবানের দিব্যনাম হরে কৃষ্ণ মহামন্ত্র হচ্ছে শ্রীকৃষ্ণের অবতার । কেবলমাত্র এই দিব্যনাম কীর্তন করার ফলে, যে কোন মানুষ সরাসরিভাবে ভগবানের সঙ্গ লাভ করতে পারে । যিনি তা করেন, তিনি অবশ্যই উদ্ধার লাভ করেন । এই নামের প্রভাবেই কেবল সমস্ত জগৎ নিস্তার পেতে পারে ।
চৈতন্য মহাপ্রভুর এক বিশেষ সৃষ্টি – প্রেম- সংকীর্তন
চৈঃ চঃ মধ্য ১১.৯৭
ভট্টাচার্য কহে এই মধুর বচন ।
চৈতন্যের সৃষ্টি—এই প্ৰেম-সংকীৰ্তন ৷৷
সার্বভৌম ভট্টাচার্য উত্তর দিলেন, “এই মধুর সঙ্গীত শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর একটি—বিশেষ সৃষ্টি । এর নাম প্ৰেম-সংকীর্তন । অর্থাৎ ভগবৎ-প্রেমে উদ্বেল হয়ে ভগবানের মহিমা কীর্তন ।” [মহারাজ প্রতাপরুদ্রের প্রতি সার্বভৌম ভট্টাচার্য]
কে বুদ্ধিমান, আর কে কলিহত ?
চৈঃ চঃ মধ্য ১১.৯৯
সংকীর্তন-যজ্ঞে তাঁরে করে আরাধন ।
সেই ত' সুমেধা, আর—কলিহতজন ৷
সংকীর্তন যজ্ঞের দ্বারা যিনি শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর আরাধনা করেন, তিনি অত্যন্ত বুদ্ধিমান। আর যিনি তা করেন না তিনিই দুর্দশাগ্রস্ত, কলিযুগের প্রভাবে আচ্ছন্ন।[মহারাজ প্রতাপরুদ্রের প্রতি সার্বভৌম ভট্টাচার্য]
গৌর-ভজনের পন্থা
চৈঃ চঃ আদি ৩.৭৭
সংকীর্তন-প্রবর্তক শ্রীকৃষ্ণচৈতন্য ।
সংকীর্তন-যজ্ঞে তাঁরে ভজে, সেই ধন্য ॥
শ্রীকৃষ্ণচৈতন্য হচ্ছেন সংকীর্তন (সমবেতভাবে ভগবানের দিব্য নামকীর্তন) যজ্ঞের প্রবর্তক । যিনি এই সংকীর্তনের মাধ্যমে তাঁর ভজনা করেন, তিনিই হচ্ছেন যথার্থ ভাগ্যবান ।
কলিযুগে শ্রীকৃষ্ণের আরাধনা করার পন্থা
চৈঃ চঃ অন্ত্য ২০.৯
সঙ্কীর্তনযজ্ঞে কলৌ কৃষ্ণ-আরাধন ।
সেই ত' সুমেধা পায় কৃষ্ণের চরণ ৷
এই কলিযুগে শ্রীকৃষ্ণের আরাধনা করার পন্থা হচ্ছে সংকীর্তন যজ্ঞ । যিনি তা করেন তিনি অবশ্যই অত্যন্ত বুদ্ধিমান এবং তিনি শ্রীকৃষ্ণের শ্রীপাদপদ্মে আশ্রয় লাভ করেন । কুলিন গ্রামবাসী সত্যরাজ খান মহাপ্রভুর প্রতি প্রশ্ন করেছিলেন “কিভাবে বৈষ্ণব চেনা যায় ? তাঁর উত্তরে মহাপ্রভু নিম্নোক্ত শ্লোকগুলি বলেছিলেন
সর্বশ্রেষ্ঠ মানব
চৈঃ চঃ মধ্য ১৫.১৬
প্রভু কহে, – “যাঁর মুখে শুনি একবার ।
কৃষ্ণনাম, সেই পূজ্য, – শ্রেষ্ঠ সবাকার ॥”
শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু তখন বললেন, “যাঁর মুখে একবার শ্রীকৃষ্ণের দিব্যনাম শুনি, তিনিই পূজ্য এবং মানুষদের মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ।”
হরিনামে কোন পুরশ্চর্যা বিধির অপেক্ষা নেই
চৈঃ চঃ মধ্য ১৫.108
দীক্ষা-পুরশ্চর্যা-বিধি অপেক্ষা না করে।
জিহ্বা-স্পর্শে আ-চণ্ডাল সবারে উদ্ধারে ॥
ভগবানের দিব্যনাম কীর্তন, দীক্ষা-পুরশ্চর্যা ইত্যাদি বিধির অপেক্ষা করে না, কেবলমাত্র জিহ্বাকে স্পর্শ করার প্রভাবেই তা আচণ্ডাল সকলকে উদ্ধার করে ।
হরিনামের আনুষঙ্গিক ফল
চৈঃ চঃ মধ্য ১৫.১৯
অনুষঙ্গ-ফলে করে সংসারের ক্ষয় ।
চিত্ত আকর্ষিয়া করায় কৃষ্ণে প্রেমোদয় ৷৷
কৃষ্ণনাম উচ্চারণের আনুষঙ্গিক ফল স্বরূপ সংসার বন্ধন মোচন হয়, এবং তারপর চিত্তকে আকর্ষণ করে শ্রীকৃষ্ণের প্রতি প্রেমের উদয় করায় ।
বৈষ্ণব
চৈঃ চঃ মধ্য ১৫.515
অতএব যাঁর মুখে এক কৃষ্ণ-নাম ।
সেই ত' বৈষ্ণব, করিহ তাঁহার সম্মান ॥
অবশেষে শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু উপদেশ দিলেন, “অতএব যিনি হরেকৃষ্ণ মহামন্ত্র কীর্তন করেন তিনি বৈষ্ণব, সুতরাং তাঁকে সর্বতোভাবে সম্মান করা উচিত।”
বৈষ্ণব-শ্রেষ্ঠ
চৈঃ চঃ মধ্য ১৬.৭
কৃষ্ণনাম নিরন্তর যাঁহার বদনে।
সেই বৈষ্ণব-শ্রেষ্ঠ, ভজ তাঁহার চরণে ৷৷
“যাঁর মুখে নিরন্তর কৃষ্ণনাম, তিনি বৈষ্ণব-শ্রেষ্ঠ তাঁর শ্রীপাদপদ্মের
ভজনা কর।”
বৈষ্ণব-প্রধান
চৈঃ চঃ মধ্য ১৬.৭8
যাঁহার দর্শনে মুখে আইসে কৃষ্ণনাম ৷
তাঁহারে জানিহ তুমি ‘বৈষ্ণব-প্ৰধান’৷৷
শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু বললেন, “যাকে দেখলে মুখে কৃষ্ণনাম আসে তাকে উত্তম বৈষ্ণব বলে জেনো।”
নামাভাসের ফল
চৈঃ চঃ মধ্য ২৫.১৯৯
এক ‘নামাভাসে' তোমার পাপ-দোষ যাবে ।
আর ‘নাম’ লইতে কৃষ্ণচরণ পাইবে ৷
শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু সুবুদ্ধি রায়কে বললেন, “হরেকৃষ্ণ মহামন্ত্র কীর্তন কর, তাহলে নামের আভাসের প্রভাবে তোমার সমস্ত পাপ মোচন হবে, এবং শুদ্ধ নাম কীর্তনের প্রভাবে শ্রীকৃষ্ণের শ্রীপাদপদ্মে আশ্রয় লাভ করবে।”
নামাভাসে নামের তেজ অক্ষুণ্ণ থাকে
চৈঃ চঃ অন্ত্য ৩.৫৫
যদ্যপি অন্য সঙ্কেতে অন্য হয় নামাভাস ৷
তথাপি নামের তেজ না হয় বিনাশ ৷৷
নামাচার্য শ্রীল হরিদাস ঠাকুর বললেন, “ভগবানকে সম্বোধন না করে যদি অন্য কিছুকে সঙ্কেত করে ভগবানের দিব্যনাম উচ্চারণ করা হয়, তাহলে তাতে নামাভাস হয়, কিন্তু তবুও তাতে নামের অপ্রাকৃত তেজ বিনষ্ট হয় না । ” [মহাপ্রভুর প্রতি হরিদাস ঠাকুর]
হরিনামের প্রকৃত ফল
চৈঃ চঃ অন্ত্য ৩.১99-598
কেহ বলে, ‘নাম হৈতে হয় পাপক্ষয়'।
কেহ বলে, – ‘নাম হৈতে জীবের মোক্ষ হয় ৷
হরিদাস কহেন, – “নামের এই দুই ফল নয় ।
নামের ফলে কৃষ্ণপদে প্ৰেম উপজয়॥ ”
তাদের কেউ কেউ বললেন, “ভগবানের দিব্যনাম গ্রহণ করার ফলে পাপ ক্ষয় হয়”; এবং অন্য কেউ বললেন, “ভগবানের দিব্যনাম গ্রহণের ফলে মুক্তি লাভ হয়।” হরিদাস ঠাকুর তখন তার প্রতিবাদ করে বললেন, “নামের এই দুটি প্রকৃত ফল নয় । নিরপরাধে নাম গ্রহণের ফলে শ্রীকৃষ্ণের শ্রীপাদপদ্মে প্রেমের উদয় হয় ।” [হিরণ্য ও গোবর্ধন মজুমদারের সভায় বিতর্কে হরিদাস ঠাকুরের উক্তি]
‘রাম’ নাম এবং ‘কৃষ্ণ’ নাম
চৈঃ চঃ অন্ত্য ৩.২৫৭
মুক্তি-হেতুক তারক হয় ‘রামনাম’।
‘কৃষ্ণনাম’ পারক হঞা করে প্রেমদান ৷৷
‘রামনাম’ অবশ্যই মুক্তিদান করেন, কিন্তু ‘কৃষ্ণনাম’ জীবকে ভব-সমুদ্র পার করে কৃষ্ণপ্রেম প্রদান করেন । [হরিদাস ঠাকুরের প্রতি মায়াদেবী]
নাম বিনা প্রেম লাভ সম্ভব নয়
চৈঃ চঃ অন্ত্য ৩.২66
মায়া-দাসী ‘প্রেম’ মাগে,—ইথে কি বিস্ময় ?
‘সাধুকৃপা’, ‘নাম’ বিনা ‘প্ৰেম’ না জন্মায় ৷৷
তাই কৃষ্ণদাসী মায়দেবী যদি এই ‘প্রেম’ ভিক্ষা করেন, তাতে বিস্মিত হবার কি আছে ? শুদ্ধভক্তের কৃপা এবং ভগবানের নামকীর্তন ব্যতীত ভগবৎ-প্রেম লাভ করা যায় না ।
নামের প্রভাব— কৃষ্ণকেও কৃষ্ণপ্রেমে মত্ত করায়
চৈঃ চঃ অন্ত্য ৩.২৬৮
কৃষ্ণ-আদি, আর যত স্থাবর-জঙ্গমে।
কৃষ্ণপ্রেমে মত্ত করে কৃষ্ণ-সঙ্কীর্তনে ॥
কৃষ্ণ আদি ভগবানের নাম এমনই আকর্ষণীয় যে সমবেতভাবে তা কীর্তন করার ফলে স্থাবর এবং জঙ্গম সমস্ত জীব কৃষ্ণপ্রেমে মত্ত হয়।
কৃষ্ণশক্তি বিনা কৃষ্ণনাম সংকীর্তন সম্ভব নয়
চৈঃ চঃ অন্ত্য ৭.১
কলিকালের ধর্ম—কৃষ্ণনাম-সঙ্কীর্তন ।
কৃষ্ণ-শক্তি বিনা নহে তার প্রবর্তন ৷৷
কলিকালের ধর্ম কৃষ্ণনাম সংকীর্তন। কৃষ্ণশক্তি বিনা তা প্রবর্তন করা সম্ভব নয়।
পতিব্রতা স্ত্রীর (জীব), পতির (কৃষ্ণ) নাম
উচারণ
চৈঃ চঃ অন্ত্য ৭.১৬-০৮
শুনি’প্ৰভু কহেন,—তুমি না জান ধৰ্ম-মর্ম ।
স্বামী-আজ্ঞা পালে,–এই পতিব্রতা-ধৰ্ম ॥
পতির আজ্ঞা,—নিরন্তর তাঁর নাম লইতে ।
পতির আজ্ঞা পতিব্রতা না পারে লঙ্ঘিতে ৷
অতএব নাম লয়, নামের ‘ফল’ পায় ৷
নামের ফলে কৃষ্ণপদে ‘প্ৰেম' উপজায় ৷৷
সেই কথা শুনে শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু বললেন, “বল্লভ-ভট্ট, তুমি ধর্মের মর্ম জান না।” স্বামীর আজ্ঞা পালন করাই পতিব্রতা স্ত্রীরধর্ম । পতি (শ্ৰীকৃষ্ণ) যখন আদেশ দিয়েছেন নিরন্তর তাঁর নাম গ্রহণ করতে, তাই পতিব্রতা স্ত্রী (কৃষ্ণভক্ত) তাঁর সেই আদেশ লঙ্ঘন করতে পারেন না। এই ধর্ম নীতি অনুসরণ করে শুদ্ধভক্ত নিরন্তর শ্রীকৃষ্ণের নাম গ্রহণ করেন, এবং তার ফলে তিনি শ্রীকৃষ্ণের শ্রীপাদপদ্মে প্রেম লাভ করেন।”
অপরাধ পরিত্যাগ করে নাম গ্রহণ
চৈঃ চঃ অন্ত্য ৭.১৩৭
অপরাধ ছাড়ি' কর কৃষ্ণসঙ্কীর্তন।
অচিরাৎ পাবে তবে কৃষ্ণের চরণ ॥
“অপরাধ পরিত্যাগ করে ‘হরেকৃষ্ণ মহামন্ত্র' সংকীর্তন করুন, তাহলে অচিরেই আপনি শ্রীকৃষ্ণের শ্রীপাদপদ্মে আশ্রয় লাভ করতে পারবেন।” [বল্লভ ভট্টের প্রতি মহাপ্রভু]
গালি দিয়ে হরিনাম
চৈঃ চঃ অন্ত্য ৫.১৫৫
কৃষ্ণে গালি দিতে করে নাম উচ্চারণ ।
সেই নাম হয় তার ‘মুক্তির' কারণ ৷৷
“কখনো কখনো শ্রীকৃষ্ণকে গালি দিয়ে কেউ তাঁর নাম উচ্চারণ করে, এবং এইভাবে ভগবানের নাম উচ্চারণ তার মুক্তির কারণ হয় ।” [বঙ্গ কবির প্রতি স্বরূপ দামোদর]
ভক্ত
মৌমাছিসদৃশ ভক্ত— কুকুরসদৃশ অভক্ত
চৈঃ চঃ আদি ১০.১
শ্রীচৈতন্যপদাম্ভোজ-মধুপেভ্যো নমো নমঃ ।
কথঞ্চিদাশ্রয়া যেষাং শ্বাপি তদ্গন্ধভাভবেৎ ॥
শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর শ্রীপাদপদ্মের মধুপানকারী মৌমাছিসদৃশ ভক্তদের আমি পুনঃ পুনঃ প্রণতি নিবেদন করি । কুকুরসদৃশ অভক্তেরা যদি কোনক্রমে এই ধরনের ভক্তদের আশ্রয় গ্রহণ করে, তা হলে সেও সেই পাদপদ্মের গন্ধ আস্বাদন করতে পারে ।
ভক্তের লেশমাত্র কৃপার প্রভাব
চৈঃ চঃ অন্ত্য ৭.১
চৈতন্যচরণাম্ভোজমকরন্দলিহো ভজে ।
যেষাং প্রসাদমাত্রেণ পামরোহপ্যমরো ভবেৎ ॥
শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু শ্রীপাদপদ্মের মধু লেহনকারী ভক্তদের আমি আমার সশ্রদ্ধ প্রণতি নিবেদন করি, যাদের লেশমাত্র কৃপার- প্রভাবে পামর পর্যন্ত মুক্তি লাভ করে ।
ভক্ততত্ত্ব
চৈঃ চঃ আদি ১.৬৪
সেই ভক্তগণ হয় দ্বিবিধ প্রকার ।
পারিষণ এক, সাধকগণ আর ৷
দুই শ্রেণীর শুদ্ধ ভক্ত রয়েছেন—ভগবানের নিত্য পার্ষদ ও সাধক ভক্ত।
ভক্তের সুদুর্লভত্ব
চৈঃ চঃ মধ্য ১৯.১৪৮
কোটিজ্ঞানী-মধ্যে হয় একজন ‘মুক্ত’ ।
কোটিমুক্ত-মধ্যে ‘দুর্লভ' এক কৃষ্ণভক্ত ৷
এই রকম কোটি কোটি জ্ঞানীর মধ্যে কদাচিৎ একজন মুক্ত হতে পারেন, এবং এই রকম কোটি কোটি মুক্তদের মধ্যে একজন কৃষ্ণভক্ত পাওয়াও দুষ্কর। [রূপ শিক্ষা]
ভক্ত-হৃদয়ে ভগবানের অবস্থান
চৈঃ চঃ আদি ১.৬১
ঈশ্বরস্বরূপ ভক্ত তাঁর অধিষ্ঠান
ভক্তের হৃদয়ে কৃষ্ণের সতত বিশ্রাম ৷
যে শুদ্ধ ভক্ত নিরন্তর ভগবানের প্রেমময়ী সেবায় যুক্ত, তিনি ভগবানেরই স্বরূপ এবং সেই ভক্তের হৃদয়ে ভগবান সর্বদাই
বিরাজ করেন ।
বিজ্ঞ ঋষিদের বাক্য ত্রুটিমুক্ত
চৈঃ চঃ আদি ২.৮৬
ভ্রম, প্রমাদ, বিপ্রলিপ্সা, করণাপাটব।
আর্য-বিজ্ঞবাক্যে নাহি দোষ এই সব ॥
বিজ্ঞ ঋষিদের বাক্যে ভ্রম (ভুল করার প্রবণতা), প্রমাদ (মোহগ্রস্ত হওয়ার প্রবণতা), বিপ্রলিপ্সা (প্রতারণা করার প্রবণতা) ও করণাপাটব (ভ্রান্ত ইন্দ্রিয়ানুভূতি) জনিত কোন দোষ বা ত্রুটি থাকে না ।
কৃষ্ণ তাঁর ভক্তদের থেকে নিজেকে লুকিয়ে রাখতে পারেন না
চৈঃ চঃ আদি ৩.৮৮
আপনা লুকাইতে কৃষ্ণ নানা যত্ন করে ।
তথাপি তাঁহার ভক্ত জানয়ে তাঁহারে ॥
শ্রীকৃষ্ণ বহুভাবে, আত্মগোপন করার চেষ্টা করেন, কিন্তু তবুও তাঁর শুদ্ধ ভক্ত তাঁকে যথাযথভাবে চিনতে পারেন ।
চৈঃ চঃ আদি ৩.৯০
অসুর-স্বভাবে কৃষ্ণে কভু নাহি জানে ৷
লুকাইতে নারে কৃষ্ণ ভক্তজন-স্থানে৷৷
যাদের স্বভাব আসুরিক, তারা কখনই শ্রীকৃষ্ণকে জানতে পারে
না। কিন্তু তাঁর শুদ্ধ ভক্তদের কাছে তিনি নিজেকে গোপন রাখতে পারেন না ।
চৈঃ চঃ অন্ত্য ৩.৯১
ঈশ্বর-স্বভাব - চাহে আচ্ছাদিতে ।
ভক্ত-ঠাঞি লুকাইতে নারে, হয় ত' বিদিতে ॥
পরমেশ্বর ভগবানের স্বভাবই এরকম—তিনি তাঁর ঐশ্বর্য লুকাতে চান, কিন্তু তাঁর ভক্তের কাছে তিনি লুকাতে পারেন না—তার কাছে সব প্রকাশ হয়ে পড়ে ।
মদীয় ভাব—ভগবান ভক্তের অধীন হন
চৈঃ চঃ আদি ৪.২১-
মোর পুত্র, মোর সখা, মোর প্রাণপতি ।
এইভাবে যেই মোরে করে শুদ্ধভক্তি ॥
আপনাকে বড় মানে, আমারে সম-হীন।
সেই ভাবে হই আমি তাহার অধীন ।।
কেউ যখন আমাকে তার পুত্র, সখা অথবা প্রেমাস্পদ মনে করে শুদ্ধ ভক্তিযোগে আমার সেবা করে এবং নিজেকে ঊর্ধ্বতন ও আমাকে তার সমকক্ষ অথবা অধস্তন বলে মনে করে, তখন আমি তার বশীভূত হই।
সর্বোত্তম পদ—‘ভক্ত-অবতার’
চৈঃ চঃ আদি ৬.৯৭
এ-সবাকে শাস্ত্রে কহে ‘ভক্ত-অবতার'।
‘ভক্ত-অবতার’-পদ উপরি সবার ॥
এদের সকলকে শাস্ত্রে বলা হয় ভক্ত-অবতার । এই ভক্ত- অবতার পদ হচ্ছে সর্বোত্তম।
কৃষ্ণের সমান হওয়া অপেক্ষা
তাঁর ভক্ত হওয়াই বড়
চৈঃ চঃ আদি ৬.১০০
কৃষ্ণের সমতা হৈতে বড় ভক্তপদ ।
আত্মা হৈতে কৃষ্ণের ভক্ত হয় প্রেমাস্পদ ৷৷
কৃষ্ণের সমতা থেকে ভক্তপদ বড়, কেন না তাঁর নিজের থেকেও ভক্তবৃন্দ শ্রীকৃষ্ণের অধিক প্রিয় ।
ভক্ত-চন্দ্ৰ
চৈঃ চঃ আদি ১৩.৫
জয় শ্রীচৈতন্যচন্দ্রের ভক্ত চন্দ্রগণ ।
সবার প্রেম-জ্যোৎস্নায় উজ্জ্বল ত্ৰিভুবন ৷৷
শ্রীচৈতন্যচন্দ্রের সমস্ত ভক্ত চন্দ্রগণের জয় হোক । তাঁদের কিরণরূপী প্রেম-জ্যোৎস্নায় ত্রিভুবন উজ্জ্বল হয়ে উঠেছে ।
কৃষ্ণের একমাত্র করণীয়
চৈঃ চঃ মধ্য ১৫.১৬৬
কৃষ্ণ সেই সত্য করে, যেই মাগে ভৃত্য ৷
ভৃত্য-বাঞ্ছা-পূর্তি বিনু নাহি অন্য কৃত্য ৷৷
তাঁর ভক্ত তাঁর কাছে যা চায়, শ্রীকৃষ্ণ তাই তাকে দেন, তাঁর সেবকের বাঞ্ছা পূর্তি ছাড়া আর অন্য কিছু করণীয় নেই । [বাসুদেব দত্তের প্রতি মহাপ্রভু
ভগবানের সুখই ভক্ত নিজের সুখ বলে গ্রহণ
করেন
চৈঃ চঃ মধ্য ৩.১৮৫
আপনার দুঃখ-সুখ তাহা নাহি গণি ।
তাঁর যেই সুখ, তাহা নিজ-সুখ মানি ৷৷
আমি আমার নিজের সুখ-দুঃখের কথা ভাবি না, তার সুখই আমার সুখ । [সন্ন্যাসের পর মহাপ্রভুর কোথায় অবস্থান করা উচিত সে সম্বন্ধে শচীমাতার মন্তব্য]
চৈঃ চঃ আদি ৩.১৮
সার্টি, সারূপ্য, আর সামীপ্য, সালোক্য ।
সাযুজ্য না লয় ভক্ত যাতে ব্ৰহ্ম-ঐক্য ॥
এই চার প্রকার মুক্তি হচ্ছে সার্টি (ভগবানের মতো ঐশ্বর্য লাভ করা,) সারূপ্য (ভগবানের মতো রূপ প্রাপ্ত হওয়া), সামীপ্য (ভগবানের পার্ষদত্ব লাভ করা) এবং সালোক্য (ভগবানের লোকে বাস করা) । ভক্তরা কখনও সাযুজ্য মুক্তি গ্রহণ করেন না, কেন না তা হলে ব্রহ্মের সঙ্গে একীভূত হয়ে যেতে হয় ।
ভগবান এবং তাঁর ভক্তদের মধ্যে স্বাভাবিক সম্বন্ধ
চৈঃ চঃ মধ্য ৪.৯৫
ব্রজবাসী লোকের কৃষ্ণে সহজ পিরীতি।
গোপালের সহজ-প্রীতি ব্ৰজবাসী-প্ৰতি ॥
কৃষ্ণভক্তি অনুশীলন করার আদর্শ স্থান হচ্ছে ব্রজভূমি বৃন্দাবন, যেখানে মানুষ স্বাভাবিকভাবে শ্রীকৃষ্ণের প্রতি প্রীতি পরায়ণ এবং শ্রীকৃষ্ণও ব্রজবাসীদের প্রতি স্বাভাবিকভাবেই প্রীতি পরায়ণ ।
ভক্ত গৃহের দাস-দাসী, কুকুরও ভগবানের প্রিয়
চৈঃ চঃ মধ্য ১৫.588
সার্বভৌম-গৃহে দাস-দাসী, যে কুক্কুর।
সেহ মোর প্রিয়, অন্যজন রহু দূর ৷
সার্বভৌম ভট্টাচার্যের গৃহের দাস-দাসী, এমনকি কুকুর পর্যন্ত আমার প্রিয় । তাঁর আত্মীয় স্বজনদের কথা আর কি বলব?
চৈঃ চঃ মধ্য ১৫.১১
তোমার কি কথা, তোমার গ্রামের কুক্কুর ।
সেই মোর প্রিয়, অন্যজন রহু দূর ৷
তোমার কি কথা, তোমার গ্রামের কুকুর পর্যন্ত আমার প্রিয়। আর অন্যদের কথা আমি কি বলব ?
[কুলিন গ্রামের অধিবাসীদের প্রতি মহাপ্রভু
ভক্তের ভক্তি-শক্তি
চৈঃ চঃ মধ্য ২০.৫৬
প্রভু কহে,— "তোমা স্পর্শি আত্ম পৰিত্রিতে।
ভক্তি-বলে পার তুমি ব্রহ্মাণ্ড শোধিতে ॥”
শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু তখন বললেন, “আমি তোমাকে স্পর্শ করছি নিজেকে পবিত্র করার জন্য । তোমার ভক্তির বলে তুমি সারা ব্রহ্মাণ্ডকে পবিত্র করতে পার।” [সনাতন গোস্বামীর প্রতি মহাপ্রভু
ভগবান কেন সর্বত্র নিজেকে প্রকাশ করেন ?
চৈঃ চঃ মধ্য ২০.২১৯
সর্বত্র প্রকাশ তাঁর—ভক্তে সুখ দিতে ।
জগতের অধর্ম নাশি' ধৰ্ম স্থাপিতে ৷৷
তাঁর ভক্তদের সুখ দেওয়ার জন্য এবং জগতের অধর্ম নাশ করে ধর্ম সংস্থাপনের জন্য ভগবান ব্রহ্মাণ্ডের সর্বত্র বিভিন্নরূপে প্রকাশিত হয়েছেন। [সনাতন শিক্ষা]
তিন প্রকার ভক্ত
চৈঃ চঃ মধ্য ২২.৬৪
শ্রদ্ধাবান্ জন হয় ভক্তি-অধিকারী।
‘উত্তম’, ‘মধ্যম’, ‘কনিষ্ঠ’—শ্রদ্ধা-অনুসারী ॥
শ্রদ্ধাবান ব্যক্তিই ভগবদ্ভক্তি লাভের যোগ্য । শ্রদ্ধার মাত্রা অনুসারে উত্তম, মধ্যম এবং কনিষ্ঠ-এই তিন প্রকার ভক্ত রয়েছে। [সনাতন শিক্ষা]
উত্তম অধিকারী
চৈঃ চঃ মধ্য ২২.৬৫
শাস্ত্রযুক্ত্যে সুনিপুণ, দৃঢ়শ্রদ্ধা যাঁর ।
‘উত্তম-অধিকারী’ সেই তারয়ে সংসার ৷
যিনি শাস্ত্র ও যুক্তিতে অত্যন্ত পারদর্শী এবং শ্রীকৃষ্ণের প্রতি শ্রদ্ধা যাঁর অত্যন্ত দৃঢ় তিনিই উত্তম অধিকারী। তিনি সারা জগৎ উদ্ধার করতে পারেন । [সনাতন শিক্ষা]
মধ্যম অধিকারী
চৈঃ চঃ মধ্য ২২.৬৭
শাস্ত্ৰ-যুক্তি নাহি জানে দৃঢ়, শ্রদ্ধাবান্ ।
মধ্যম-অধিকারী' সেই মহা-ভাগ্যবান্ ॥
যিনি শাস্ত্রের ভিত্তিতে যুক্তি প্রদর্শনে দক্ষ নন অথচ দৃঢ় শ্রদ্ধাবান, তিনি মধ্যম অধিকারী । তিনি মহাভাগ্যবান। [সনাতন শিক্ষা]
কনিষ্ঠ অধিকারী
চৈঃ চঃ মধ্য ২২.৬৯
যাহার কোমল শ্রদ্ধা, সে ‘কনিষ্ঠ' জন।
ক্ৰমে ক্ৰমে তেঁহো ভক্ত হইবে ‘উত্তম’ ॥
যারা শ্রদ্ধা কোমল, তাকে বলা হয় কনিষ্ঠ অধিকারী, কিন্তু ভগবদ্ভক্তির পন্থা অনুসরণ করার ফলে তিনি ধীরে ধীরে উত্তম অধিকারী ভক্তে পরিণত হবেন। [সনাতন শিক্ষা]
ভগবান তাঁর ভক্তের ভেতর ও বাহিরে নিজেকে প্রকাশ করেন
চৈঃ চঃ মধ্য 25.155
পঞ্চভূত যৈছে ভূতের ভিতরে-বাহিরে ।
ভক্তগণে স্ফুরি আমি বাহিরে-অন্তরে ৷
পঞ্চভূত যেমন প্রাণীদের ভিতরে এবং বাইরে অবস্থিত, তেমনই আমি ভক্তদের ভিতরে ও বাইরে স্ফূর্তি প্রাপ্ত হই । [প্রকাশানন্দ সরস্বতীর প্রতি মহাপ্রভু]
ভগবান তাঁর ভক্তের হৃদয়ে বদ্ধ
চৈঃ চঃ মধ্য ২৫.159
ভক্ত আমা প্রেমে বান্ধিয়াছে হৃদয়-ভিতরে।
যাঁহা নেত্র পড়ে তাঁহা দেখয়ে আমারে ৷৷
ভক্ত আমাকে তার হৃদয়ে প্রেমের বন্ধনে বেঁধে রেখেছে । যেখানেই তার নেত্র পড়ে সেখানেই সে আমাকে দর্শন করে । [প্রকাশানন্দ সরস্বতীর প্রতি মহাপ্রভু]
বৈষ্ণবের দেহ কখনো প্রাকৃত নয়
চৈঃ চঃ অন্ত্য ৪.১৯
প্রভু কহে,— “বৈষ্ণব-দেহ ‘প্রাকৃত' কভু নয় ।
‘অপ্রাকৃত’ দেহ ভক্তের ‘চিদানন্দময়’॥
শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু বললেন, “ভক্তের দেহ কখনই প্ৰাকৃত নয় । তা চিদানন্দময় অপ্রাকৃত দেহ।”
দীক্ষাকালে ভক্ত ও ভগবানের কার্য
চৈঃ চঃ অন্ত্য ৪.১৯
দীক্ষাকালে ভক্ত করে আত্মসমর্পণ ।
সেইকালে কৃষ্ণ তারে করে আত্মসম ॥
দীক্ষার সময়, ভক্ত যখন নিজেকে সর্বতোভাবে শ্রীকৃষ্ণের সেবায় উৎসর্গ করেন, তখন শ্রীকৃষ্ণ তাকে নিজের বলে গ্রহণ করেন । [হরিদাস ঠাকুর ও সনাতন গোস্বামীর প্রতি মহাপ্রভু]
ব্রাহ্মণ সেবা
চৈঃ চঃ মধ্য ৫.২৪
ব্রাহ্মণ-সেবায় কৃষ্ণের প্রীতি বড় হয় ।
তাঁহার সন্তোষ ভক্তি-সম্পদ্ বাড়য়” ৷
ব্রাহ্মণের সেবা করা হলে শ্রীকৃষ্ণ খুব প্রীত হন এবং ভগবান প্রীত হলে, ভগবদ্ভক্তিরূপ সম্পদ বর্ধিত হয়।
[সাক্ষী গোপাল লীলায় বড় বিপ্রের প্রতি ছোট বিপ্ৰ]
ভক্তের নিকট প্রার্থনা
চৈঃ চঃ অন্ত্য ১১.৮
জয় গৌরভক্তগণ, –গৌর যাঁর প্রাণ ।
সব ভক্ত মিলি' মোরে ভক্তি দেহ' দান ৷৷
শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু যাঁদের প্রাণস্বরূপ, মহাপ্রভুর সেই ভক্তবৃন্দের জয় হোক । আপনারা সকলে মিলে আমাকে ভগবদ্ভক্তি দান করুন।
অভক্ত অভক্তদের পরিণতি
চৈঃ চঃ আদি ১২.৭০-৭১
চৈতন্য-রহিত দেহ—শুষ্ককাষ্ঠ-সম ।
জীবিতেই মৃত সেই, মৈলে দণ্ডে যম ৷
কেবল এ গণ-প্রতি নহে এই দণ্ড ৷
চৈতন্য-বিমুখ যেই সেই ত' পাষণ্ড ৷৷
কি পণ্ডিত, কি তপস্বী, কিবা গৃহী, যতি ।
চৈতন্য-বিমুখ যেই, তার এই গতি ৷৷
কৃষ্ণচেতনা-বিহীন মানুষ একটি শুষ্ক কাষ্ঠ অথবা মৃত দেহের মতো । সে জীবিত অবস্থাতেই মৃতের মতো এবং মৃত্যুর পর যমরাজ তাকে দণ্ডদান করবেন । অদ্বৈত আচার্যের বিপথগামী গণেরাই কেবল নয়, চৈতন্য-বিমুখ যে জন, সেই পাষণ্ড এবং যমরাজ তাকেও দণ্ড দান করবেন । তা তিনি পণ্ডিতই হোন, মহা তপস্বী হোন, সার্থক গৃহস্থ হোন অথবা বিখ্যাত সন্ন্যাসী হোন, তিনি যদি শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর বিরোধী হন, তা হলে তাকে যমরাজের হাতে দণ্ডভোগ করতেই হবে ।
সঙ্গ-সাধু-বৈদ্য
চৈঃ চঃ মধ্য ২২.১৪-১৫
কাম-ক্রোধের দাস হঞা তার লাথি খায় ৷
ভ্রমিতে ভ্রমিতে যদি সাধু-বৈদ্য পায় ৷৷
তাঁর উপদেশ-মন্ত্রে পিশাচী পলায় ৷
কৃষ্ণভক্তি পায়, তবে কৃষ্ণ-নিকট যায় ৷৷
কাম-ক্রোধের দাস হয়ে বদ্ধ জীবেরা তার লাথি খায় । এইভাবে ব্রহ্মাণ্ডে ভ্রমণ করতে করতে যদি সে সৌভাগ্যক্রমে কোন সাধুরূপ বৈদ্যকে পায়, তাহলে তাঁর উপদিষ্ট মন্ত্র গ্রহণ করার ফলে সেই পিশাচী পালায়। সেই মন্ত্রের আশ্রয় অবলম্বন করার ফলে সে কৃষ্ণভক্তিলাভ করে এবং অবশেষে শ্রীকৃষ্ণের কাছে ফিরে যায় । [সনাতন শিক্ষা]
কৃষ্ণ-রতি
চৈঃ চঃ মধ্য ২২.৪৫
কোন ভাগ্যে কারো সংসার ক্ষয়োন্মুখ হয় ৷
সাধুসঙ্গে তবে কৃষ্ণে রতি উপজয় ৷৷
ভাগ্যক্রমে কেউ যদি সংসার সমুদ্র উত্তীর্ণ হওয়ার যোগ্যতা অর্জন করেন এবং এইভাবে তার ভববন্ধন ক্ষয় উন্মুখ হয়, তাহলে সাধুসঙ্গের প্রভাবে তার কৃষ্ণের প্রতি আসক্তির উদয় হয় । [সনাতন শিক্ষা]
এক নিমেষে সর্বসিদ্ধি
চৈঃ চঃ মধ্য ২২.৫৪
‘সাধুসঙ্গ', ‘সাধুসঙ্গ’—সর্বশাস্ত্রে কয় ।
লবমাত্র সাধুসঙ্গে সর্বসিদ্ধি হয় ৷৷
সমস্ত শাস্ত্রে বর্ণনা করা হয়েছে যে এক নিমেষের জন্য শুদ্ধভক্তের সঙ্গলাভ হলে সর্বসিদ্ধি হয় । [সনাতন শিক্ষা]
কৃষ্ণভক্তির মূল কারণ এবং মুখ্য অঙ্গ—সাধু সঙ্গ
চৈঃ চঃ মধ্য ২২.৮৩
কৃষ্ণভক্তি-জন্মমূল হয় ‘সাধুসঙ্গ'।
কৃষ্ণপ্রেম জন্মে, তেঁহো পুনঃ মুখ্য অঙ্গ ৷
কৃষ্ণভক্তির মূল কারণ সাধুসঙ্গ। এমন কি যখন সুপ্ত কৃষ্ণপ্রেম জাগরিত হয়, তখন ভগবদ্ভক্তের সঙ্গ অত্যন্ত প্ৰয়োজন । [সনাতন শিক্ষা]
সাধুসঙ্গের পূর্বশর্ত—শ্ৰদ্ধা
চৈঃ চঃ মধ্য ২৩.৯
কোন ভাগ্যে কোন জীবের ‘শ্রদ্ধা' যদি হয় ।
তবে সেই জীব ‘সাধুসঙ্গ' যে করয় ৷
কোন ভক্তি-উন্মুখী সুকৃতির বলে কোন জীবের যদি অনন্যভক্তির প্রতি শ্রদ্ধা জন্মায়, তাহলে সেই জীব শুদ্ধভক্তরূপ সাধুর সঙ্গ করেন । [সনাতন শিক্ষা]
দুঃসঙ্গ কি ?
চৈঃ চঃ মধ্য ২৪.৯৯
‘দুঃসঙ্গ' কহিয়ে—‘কৈতব’, ‘আত্মবঞ্চনা” ।
কৃষ্ণ, কৃষ্ণভক্তি বিনা অন্য কামনা ৷৷
ছলনা বিশিষ্ট আত্ম বঞ্চকই ‘দুঃসঙ্গ' । কৃষ্ণকাম ও কৃষ্ণভক্তি কামনা ব্যতীত অপর সমস্ত কামই দুঃসঙ্গ । [সনাতন শিক্ষা]
কৃষ্ণের প্রতি ভাব লাভের ত্রিশর্ত
চৈঃ চঃ মধ্য ২৪.108
সাধুসঙ্গ, কৃষ্ণকৃপা, ভক্তির স্বভাব ।
এ তিনে সব ছাড়ায়, করে কৃষ্ণে ‘ভাব’ ॥
ভগবদ্ভক্ত সঙ্গ, শ্রীকৃষ্ণের কৃপা এবং ভগবদ্ভক্তির স্বভাব, ধীরে ধীরে সমস্ত অসৎ প্রভাব থেকে মুক্ত করে শ্রীকৃষ্ণের ভাব উৎপন্ন করে । [সনাতন শিক্ষা]
দু' প্রকার অসৎসঙ্গ
চৈঃ চঃ মধ্য ২২.৭
অসৎসঙ্গত্যাগ,—এই বৈষ্ণব-আচার।
‘স্ত্রীসঙ্গী’– এক অসাধু, ‘কৃষ্ণাভক্ত’ আর ॥
অবৈষ্ণব সঙ্গ পরিত্যাগীই বৈষ্ণবের একমাত্র সদাচার। অবৈষ্ণব বলতে স্ত্রীসঙ্গী ও কৃষ্ণের অভক্ত—এই দুই শ্রেণীর লোককে বোঝায়। [সনাতন শিক্ষা]
বিষয়ী এবং স্ত্রীসঙ্গের ভয়াবহতা
চৈঃ চঃ মধ্য ১১.৭
বিরক্ত সন্ন্যাসী আমার রাজ-দরশন ।
স্ত্রী-দরশন-সম বিষের ভক্ষণ ৷৷
আমি বিরক্ত সন্ন্যাসী; তাই আমার পক্ষে রাজাকে দর্শন করা কোন স্ত্রীলোককে দর্শন করারই মতো । এই উভয় দর্শনই বিষভক্ষণের মতো ভয়ঙ্কর । [মহারাজ প্রতাপরুদ্রকে দর্শন প্রদানের জন্য সার্বভৌম ভট্টাচার্য
শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর কাছে পুনরায় নিবেদন করলে মহাপ্রভুর প্রত্যুত্তর]
চৈঃ চঃ মধ্য ১১.১
প্রভু কহে,—তথাপি রাজা কালসর্পাকার ।
কাষ্ঠনারী-স্পর্শে যৈছে উপজে বিকার ॥
শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু বলেছেন, “কিন্তু তাহলেও রাজা কালসর্পের মতো ভয়ঙ্কর । কাঠের তৈরি নারীমূর্তি স্পর্শ করলে যেমন চিত্তের বিকার হয়, তেমনই রাজাকে দর্শন করলেও বিষয়াসক্তির উদয় হয়।”
[মহারাজ প্রতাপরুদ্রকে দর্শন প্রদানের জন্য সার্বভৌম ভট্টাচার্য শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর কাছে নিবেদন করলে মহাপ্রভুর প্রত্যুত্তর]
কাঠের স্ত্রীমূর্তি
চৈঃ চঃ অন্ত্য ২.১১৮
দুর্বার ইন্দ্রিয় করে বিষয়-গ্রহণ ।
দারবী প্রকৃতি হরে মুনেরপি মন ৷৷
ইন্দ্রিয়গুলি এমনই প্রবলভাবে ইন্দ্রিয়ের বিষয়ের প্রতি আসক্ত যে কাষ্ঠ নির্মিত স্ত্রী মূর্তি পর্যন্ত মুনিদের চিত্ত হরণ করে । [ছোট হরিদাসকে পরিত্যাগের কারণ কি ভক্তরা তা জানতে চাইলে মহাপ্রভুর উত্তর]
একবিন্দু সুরা, পূর্ণ দুধের কলসকে অপবিত্র করতে পারে
চৈঃ চঃ মধ্য ১২.৫৩-৫৪
প্ৰভু কহে,—পূর্ণ যৈছে দুগ্ধের কলস।
সুরাবিন্দু-পাতে কেহ না করে পরশ ৷৷
যদ্যপি প্রতাপরুদ্র সর্বগুণবান্ ।
তাঁহারে মলিন কৈল এক ‘রাজা’-নাম ৷৷
শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু বললেন,—"একটি পূর্ণ দুধের কলসে যদি একবিন্দু সুরা পড়ে, তাহলে যেমন কেউ তা স্পর্শ করে না, তেমনই মহারাজ প্রতাপরুদ্র সর্বগুণবান হওয়া সত্ত্বেও এক ‘রাজা” উপাধি তাকে মলিন করে দিল ।” [মহারাজ প্রতাপরুদ্রকে দর্শন প্রদানের জন্য রামানন্দ রায় মহাপ্রভুর কাছে অনুরোধ করলে মহাপ্রভুর প্রত্যুত্তর]
সিদ্ধান্তসমুদ্র হৃদয়ঙ্গমের উপায় — গৌরভক্তের নিত্য সঙ্গ
চৈঃ চঃ অন্ত্য ৫.১৩
চৈতন্যের ভক্তগণের নিত্য কর ‘সঙ্গ’।
তবেত জানিবা সিদ্ধান্তসমুদ্র-তরঙ্গ ৷
শ্রীল স্বরূপ দামোদর গোস্বামী তাকে বললেন, “নিরন্তর শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর ভক্তদের সঙ্গ কর, তাহলেই কেবল ভগবৎ সিদ্ধান্ত সমুদ্রের তরঙ্গ হৃদয়ঙ্গম করতে পারবে।” [বঙ্গ কবির প্রতি স্বরূপ দামোদর]
রাগমার্গীয় ভক্তদের সাথে কেমন সঙ্গ হওয়া উচিত ?
চৈঃ চঃ অন্ত্য ১৩.৩৭
দুরে রহি' ভক্তি করিহ সঙ্গে না রহিবা ।
তাঁ-সবার আচার-চেষ্টা লইতে নারিবা ॥
“দূর থেকে তাঁদের ভক্তি কর, এবং তাঁদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে মেলামেশা কর না, এবং তাঁদের আচার-আচরণের অনুকরণ করার চেষ্টা কর না । ”
[জগদানন্দ পণ্ডিতের বৃন্দাবন যাত্রার প্রাক্কালে সেখানকার রাগমার্গীয় ভক্তদের সাথে কিরূপ আচরণ করা উচিত সে বিষয়ে তাঁর প্রতি মহাপ্রভুর নির্দেশ]
বৈষ্ণব গুণাবলী
কৃষ্ণের সমস্ত গুণ তাঁর ভক্তের মধ্যে সঞ্চারিত হয়
চৈঃ চঃ মধ্য ২২.৭৫
সর্ব মহা-গুণগণ বৈষ্ণব-শরীরে ।
কৃষ্ণভক্তে কৃষ্ণের গুণ সকলি সঞ্চারে ॥
বৈষ্ণবের শরীরে সমস্ত দিব্য গুণগুলি প্রকাশিত হতে দেখা যায় । কৃষ্ণের সমস্তগুণ কৃষ্ণভক্তের মধ্যে সঞ্চারিত হয় । [সনাতন শিক্ষা]
বৈষ্ণবের ২৬ টি গুণ
চৈঃ চঃ মধ্য ২২.৭৮-৮০
কৃপালু, অকৃতদ্রোহ, সত্যসার, সম ।
নির্দোষ, বদান্য, মৃদু, শুচি, অকিঞ্চন ৷
সর্বোপকারক, শান্ত, কৃষ্ণৈকশরণ।
অকাম, অনীহ, স্থির, বিজিত-ষড়্গগুণ ৷
মিতভুক্, অপ্রমত্ত, মানদ, অমানী ।
গম্ভীর, করুণ, মৈত্র, কবি, দক্ষ, মৌনী ॥
ভগবদ্ভক্ত সর্বদাই কৃপালু, বিনীত, সত্যবাদী, সমদর্শী, নির্দোষ, বদান্য, মৃদু, শুচি, অকিঞ্চন, সকলের উপকারক, শান্ত, কেবল কৃষ্ণের শরণাগত, নিষ্কাম, অনীহ, স্থির, বিজিত ষড়গুণ, মিতভুক, অপ্রমত্ত, মানদ, অমানী, গম্ভীর, করুণ, মৈত্র, কবি, দক্ষ এবং মৌনী। [সনাতন শিক্ষা]
চৈঃ চঃ আদি ৮.৫৫
সুশীল, সহিষ্ণু, শান্ত, বদান্য, গম্ভীর ৷
মধুর-বচন, মধুর-চেষ্টা, মহাধীর ৷
তিনি ছিলেন সুশীল, সহিষ্ণু, শান্ত, বদান্য, গম্ভীর, তাঁর বাণী ছিল মধুর এবং তাঁর আচরণ ছিল মহাধীর ।
[বৃন্দাবনে শ্রীগোবিন্দ-দেবের সেবার অধ্যক্ষ হরিদাস পণ্ডিতের গুণাবলী ]
বিনয়
কৃষ্ণদাস কবিরাজ গোস্বামী
চৈঃ চঃ আদি ৫.২05-06
জগাই মাধাই হৈতে মুঞি সে পাপিষ্ঠ ।
পুরীষের কীট হৈতে মুঞি সে লঘিষ্ঠ ৷৷
মোর নাম শুনে যেই তার পুণ্য ক্ষয় ।
মোর নাম লয় যেই তার পাপ হয় ॥
আমি জগাই এবং মাধাই-এর থেকেও বড় পাপী এবং পুরীষের কীট থেকেও ঘৃণ্য । যে আমার নাম শোনে তার পুণ্য ক্ষয় হয় । যে আমার নাম উচ্চারণ করে তাঁর পাপ হয় ।
হরিদাস ঠাকুর
চৈঃ চঃ অন্ত্য ১১.59
হীন-জাতি জন্ম মোর নিন্দ্য-কলেবর ।
হীনকর্মে রত মুঞি অধম পামর ৷৷
নীচু পরিবারে আমার জন্ম হয়েছে, এবং আমার এই দেহও অত্যন্ত নিন্দনীয় । আমি সব সময় নীচ-কর্মে রত ছিলাম, তাই, আমি অত্যন্ত অধম ও পামর ।
চৈঃ চঃ অন্ত্য 11.85
‘ভক্তবৎসল’ প্রভু তুমি, মুই ‘ভক্তাভাস’।
অবশ্য পূরাবে, প্রভু, মোর এই আশ ॥”
হে প্রভু, তুমি ভক্তবৎসল । আমি তোমার ভক্তের আভাস মাত্র, কিন্তু দয়া করে তুমি অবশ্যই আমার এই আশা পূর্ণ কর ।
রূপ-সনাতন
চৈঃ চঃ মধ্য ১.১৮৯
নীচ-জাতি, নীচ-সঙ্গী, করি নীচ কাজ ।
তোমার অগ্রেতে প্রভু কহিতে বাসি লাজ ॥
প্রভু আমরা সব চাইতে অধঃপতিত স্তরের মানুষ, আমাদের সঙ্গীরাও অত্যন্ত নীচ এবং আমরা অত্যন্ত নীচ কাজ করি । তাই আপনার সামনে আমরা নিজেদের পরিচয় দিতে লজ্জা বোধ করি, এমন কি আপনার সামনে আসতেও আমরা লজ্জা বোধ করি ।
চৈঃ চঃ মধ্য ১.১৯১
পতিত-পাবন-হেতু তোমার অবতার ।
আমা-বই জগতে, পতিত নাহি আর ॥
দুই ভাই বললেন, “হে প্রভু! পতিত জীবদের উদ্ধার করার জন্য আপনি অবতীর্ণ হয়েছেন। আমাদের চেয়ে পতিত এই জগতে আর কেউ নেই ।”
চৈঃ চঃ মধ্য ১.১৯৬
জগাই-মাধাই হৈতে কোটী কোটী গুণ ।
অধম পতিত পাপী আমি দুই জন ৷৷
“আমরা দুজন জগাই-মাধাই থেকেও কোটি কোটি গুণ অধম, পতিত এবং পাপী । ”
সনাতন গোস্বামী
চৈঃ চঃ মধ্য ২০.১00
আপনার হিতাহিত কিছুই না জানি !
গ্রাম্য-ব্যবহারে পণ্ডিত, তাই সত্য মানি ॥
কি করলে যে আমার ভাল হবে এবং কি করলে যে আমার খারাপ হবে, সে সম্বন্ধে কোন জ্ঞানই আমার নেই । কিন্তু তবুও, জাগতিক ব্যবহারে লোকেরা আমাকে পণ্ডিত বলে মনে করে, এবং আমিও মনে করি যেন তা সত্যি ।
ভক্তরা কখনো নিজেদের গুণের কথা বলেন না
চৈঃ চঃ অন্ত্য ৫.৭৮
মহানুভবের এই সহজ ‘স্বভাব’ হয়।
আপনার গুণ নাহি আপনে কহয় ॥
“এইটি মহানুভব ভক্তের স্বভাব। তারা নিজেরা কখনো নিজেদের গুণের কথা বলেন না ।” [প্রদ্যুম্ন মিশ্রের প্রতি মহাপ্ৰভু
কৃতজ্ঞতা -হরিদাস ঠাকুর
চৈঃ চঃ অন্ত্য ১১.
অদৃশ্য, অস্পৃশ্য মোরে অঙ্গীকার কৈলা ।
রৌরব হইতে কাড়ি' মোরে বৈকুণ্ঠে চড়াইলা ॥
আমি ছিলাম অস্পৃশ্য এবং অদৃশ্য, কিন্তু তোমার সেবকরূপে আমাকে অঙ্গীকার করে তুমি আমাকে রৌরব থেকে উদ্ধার করে বৈকুণ্ঠলোকে উন্নীত করেছ ।
অন্য ভক্তের প্রশংসা করা; অন্য সকল ভক্তদের দ্বারা হরিদাস ঠাকুরের প্রশংসা
চৈঃ চঃ অন্ত্য ১১.৫
হরিদাসের গুণে সবার বিস্মিত হয় মন।
সর্বভক্ত বন্দে হরিদাসের চরণ ৷
হরিদাস ঠাকুরের অপ্রাকৃত গুণাবলী শ্রবণ করে সকলে অত্যন্ত বিস্মিত হলেন, এবং তাঁরা সকলে হরিদাস ঠাকুরের শ্রীপাদপদ্মে বন্দনা করতে লাগলেন ।
কৃষ্ণদাস কবিরাজ গোস্বামী কর্তৃক বৃন্দাবনে শ্রীগোবিন্দ-দেবের সেবাধ্যক্ষ হরিদাস পণ্ডিতের প্ৰশংসা
চৈঃ চঃ আদি ৮.৬
বৈষ্ণবের গুণগ্রাহী, না দেখয়ে দোষ ।
কায়মনোবাক্যে করে বৈষ্ণব-সন্তোষ ॥
তিনি সর্বদা বৈষ্ণবের সদগুণগুলি দর্শন করতেন এবং কখনও তাঁদের দোষ দেখতেন না । কায়মনোবাক্যে তিনি বৈষ্ণবদের সন্তুষ্টি বিধান করতেন ।
সত্যবাদিতা
চৈঃ চঃ মধ্য ৫.৯০
এত জানি' তুমি সাক্ষী দেহ, দয়াময় ৷
জানি' সাক্ষী নাহি দেয়, তার পাপ হয় ৷
ছোট বিপ্ৰ বললেন, “হে প্রভু, আপনি অত্যন্ত দয়াময় এবং আপনি সব কিছুই জানেন । তাই, দয়া করে আপনি সাক্ষ্য দান করুন। যদি কোন ব্যক্তি জেনে-শুনেও সাক্ষ্য না দেয়, তা হলে তার পাপ হয় ।” সাক্ষী-গোপালের প্রতি ছোট বিপ্ৰ
কৃপালু -মহান্ত স্বভাব
চৈঃ চঃ মধ্য ৮.৩৯
মহান্ত-স্বভাব এই তারিতে পামর ৷
নিজ কার্য নাহি তবু যান তার ঘর ৷
“মহান্তের স্বভাবই হচ্ছে পতিতদের উদ্ধার করা । তাই তাঁদের নিজেদের কোন প্রয়োজন না থাকলেও তাঁরা মানুষদের বাড়ীতে যান।” [গোদাবরী তটে প্রথম সাক্ষাতে মহাপ্রভুর প্রতি রামানন্দ রায়]
চৈঃ চঃ আদি ১১.৫৯
অনর্গল প্রেম সবার, চেষ্টা অনর্গল ।
প্রেম দিতে, কৃষ্ণ দিতে ধরে মহাবল ৷৷
নিরবচ্ছিন্নভাবে অবিরত কৃষ্ণপ্রেম দান করার মহাশক্তি এই সমস্ত ভক্তদের ছিল । সেই শক্তির দ্বারা তাঁরা যে কাউকে কৃষ্ণ ও কৃষ্ণপ্রেম দান করতে পারতেন । [নিত্যানন্দ প্রভুর পার্ষদদের মহিমা ]
বদ্ধ জীবের প্রতি বাসুদেব দত্তের কৃপা
চৈঃ চঃ মধ্য ১৫.165-163
জীবের দুঃখ দেখি' মোর হৃদয় বিদরে ।
সর্বজীবের পাপ প্রভু দেহ' মোর শিরে ৷
জীবের পাপ লঞা মুঞি করোঁ নরক ভোগ ।
সকল জীবের, প্রভু ঘুচাহ ভবরোগ ॥
“হে প্রভু, জীবের দুঃখ দেখে আমার হৃদয় বিদীর্ণ হয়, তুমি দয়া করে সমস্ত জীবের পাপ আমার মাথায় দাও । সেই পাপ নিয়ে আমি নরক ভোগ করি, আর সমস্ত জীব ভবরোগ থেকে মুক্তি লাভ করুক।”
[মহাপ্রভুর প্রতি বাসুদেব দত্ত]
মহাভাগবতের দৃষ্টি
চৈঃ চঃ মধ্য ৮.২93-598
মহাভাগবত দেখে স্থাবর-জঙ্গম ৷
তাহা তাহা হয় তাঁর শ্রীকৃষ্ণ-স্ফুরণ ৷
স্থাবর-জঙ্গম দেখে, না দেখে তার মূর্তি ।
সর্বত্র হয় নিজ ইষ্টদেব-স্ফূর্তি ।।
স্থাবর-জঙ্গম সবকিছুতেই মহাভাগবত পরমেশ্বর ভগবানকে দর্শন করেন। তিনি সবকিছুকেই শ্রীকৃষ্ণের প্রকাশরূপে দর্শন করেন । মহাভাগবত স্থাবর-জঙ্গম দর্শন করেন, কিন্তু তিনি তাদের রূপ দর্শন করেন না। পক্ষান্তরে, তিনি সর্বত্র পরমেশ্বর ভগবানকে
দর্শন করেন। [রামানন্দ রায় যখন মহাপ্রভুকে কৃষ্ণ বলে অনুধাবন করলেন
তখন মহাপ্রভু তা অস্বীকার করেন
মহাভাগবতের ভ্রমণ
চৈঃ চঃ মধ্য ১০.১
তীর্থ পবিত্র করিতে করে তীর্থভ্রমণ ।
সেই ছলে নিস্তারয়ে সাংসারিক জন ৷৷
তীর্থ পবিত্র করার জন্য তাঁরা তীর্থ ভ্রমণ করেন, এবং সেই ছলে জড় জগতের বন্ধনে আবদ্ধ মানুষদের উদ্ধার করেন । [মহারাজ প্রতাপরুদ্র যখন সার্বভোম ভট্টাচার্যকে জিজ্ঞাসা করলেন যে, কেন মহাপ্রভু জগন্নাথ পুরী ছেড়ে তীর্থ ভ্রমণে গেলেন, তার উত্তরে ভট্টাচার্য বললেন, “মহান্তের এই এক লীলা”
চৈঃ চঃ মধ্য ৮.৩৯
মহান্ত-স্বভাব এই তারিতে পামর।
নিজ কার্য নহি তবু যান তার ঘর ॥
“মহান্তের স্বভাবই হচ্ছে পতিতদের উদ্ধার করা । তাই তাঁদের নিজেদের কোন প্রয়োজন না থাকলেও তাঁরা মানুষদের বাড়ীতে যান।” [গোদাবরী তটে প্রথম সাক্ষাতে মহাপ্রভুর প্রতি রামানন্দ রায়]
ভগবানের প্রতি একান্ত রতি
চৈঃ চঃ মধ্য ৭.৪৮
শিরে বজ্র পড়ে যদি, পুত্র মরি' যায় ৷
তাহা সহি, তোমার বিচ্ছেদ সহন না যায় ৷
আমার মাথায় যদি বজ্রপাত হয় অথবা আমার পুত্র যদি মরে যায়, তাও আমি সহ্য করতে পারি, কিন্তু তোমার বিরহজনিত দুঃখ আমি সহ্য করতে পারব না । [মহাপ্রভুর দক্ষিণ ভারত ভ্রমণের কথা শ্রবণ করে সার্বভৌম ভট্টাচার্যের অভিব্যক্তি]
মুরারি গুপ্তের রামভক্তি
চৈঃ চঃ মধ্য ১৫.১৪৯-১৫১
রঘুনাথের পায় মুঞি বেচিয়াছোঁ মাথা ।
কাঢ়িতে না পারি মাথা, মনে পাই ব্যথা ৷৷
শ্রীরঘুনাথ-চরণ ছাড়ান না যায় ৷
তব আজ্ঞা-ভঙ্গ হয়, কি করোঁ উপায় ॥
তাতে মোরে এই কৃপা কর, দয়াময় ।
তোমার আগে মৃত্যু হউক, যাউক সংশয় ॥
শ্রীরামচন্দ্রের চরণে আমি আমার মাথা বিকিয়ে দিয়েছি, সেই মাথা আমি আর প্রত্যাহার করতে পারছি না, তাই আমার মনে খুব বেদনা হচ্ছে । আমি শ্রীরঘুনাথের শ্রীচরণ ছাড়তে পারছি না । আবার এদিকে তোমার আজ্ঞাও ভঙ্গ করতে পারি না, এখন আমি কি করি । তাই দয়াময়, তুমি আমাকে কৃপা করো, তোমার সামনে আমার মৃত্যু হোক এবং তার ফলে আমার
সমস্ত সংশয় দূর হোক । [মহাপ্রভু মুরারি গুপ্তকে বললেন রামভজন পরিত্যাগ করে কৃষ্ণভজন করতে। পরবর্তী দিন প্রাতঃকালে মুরারি গুপ্ত এসে মহাপ্রভুর চরণ ধরে ক্রন্দন করে বলতে লাগলেন
আমি রঘুনাথের শ্রীপাদপদ্মে আমার মস্তক বিক্রয় করেছি
চৈঃ চঃ অন্ত্য ৪.৪০-81
‘রঘুনাথের পাদপদ্মে বেচিয়াছোঁ মাথা ৷
কাড়িতে না পারোঁ মাথা, পাঙ বড় ব্যথা ॥
কৃপা করি' মোরে আজ্ঞা দেহ' দুইজন ৷
জন্মে-জন্মে সেবোঁ রঘুনাথের চরণ ॥
আমি রঘুনাথের শ্রীপাদপদ্মে আমার মস্তক বিক্রয় করেছি। তা আমি এখন আর ফিরিয়ে নিতে পারছি না, সেজন্য আমি গভীর বেদনা অনুভব করছি। কৃপা করে তোমরা দুজন আমাকে আশীর্বাদ কর যেন জন্ম-জন্মান্তরে আমি শ্রীরঘুনাথের শ্রীপাদপদ্মের সেবা করতে পারি । [যখন জ্যেষ্ঠ ভ্রাতৃদ্বয় শ্রী রূপ ও শ্রী সনাতন গোস্বামী তাঁদের কনিষ্ঠ ভ্রাতা শ্রী অনুপমকে আমন্ত্রণ করলেন যে, তিনি যেন শ্রী রামচন্দ্রের ভজন পরিত্যাগ করে তাদের সাথে কৃষ্ণভজন শুরু করেন, তখন অনুপমের অভিব্যক্তি]
অনন্য শরণ
চৈঃ চঃ মধ্য ১০.৫৫
নিজ-গৃহ-বিত্ত-ভৃত্য-পঞ্চপুত্র-সনে।
আত্মা সমৰ্পিলঁ আমি তোমার চরণে ৷
শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর করুণার স্বীকৃতি প্রদর্শন করে ভবানন্দ রায় বললেন, “আমার গৃহ, ধন-সম্পদ, বিত্ত এবং পঞ্চপুত্রসহ আমি নিজেকে তোমার চরণে সমর্পণ করলাম।” [দক্ষিণ-ভারত পর্যটনের পর মহাপ্রভু জগন্নাথ পুরীতে প্রত্যাবর্তন করলে রামানন্দ রায়ের পিতা ভবানন্দ রায় তাঁর পুত্রদের নিয়ে মহাপ্রভুর সাথে সাক্ষাৎ করতে এলেন...]
নিষ্কাম
চৈঃ চঃ মধ্য ১৯.৪৯
কৃষ্ণভক্ত—নিষ্কাম, অতএব ‘শান্ত’ ।
ভুক্তি-মুক্তি-সিদ্ধি-কামী, সকলি ‘অশান্ত’ ৷
কৃষ্ণভক্ত যেহেতু নিষ্কাম তাই তিনি শান্ত । কিন্তু ভুক্তিকামী কর্মী, মুক্তিকামী জ্ঞানী এবং সিদ্ধিকামী যোগীরা জড় কামনা বাসনা থেকে মুক্ত হতে পারেনি বলে অশান্ত । [রূপ-শিক্ষা]
দৃঢ় শ্রদ্ধা
চৈঃ চঃ মধ্য ২২.৬
‘শ্রদ্ধা’-শব্দে—বিশ্বাস কহে সুদৃঢ় নিশ্চয় ।
কৃষ্ণে ভক্তি কৈলে সর্বকৰ্ম কৃত হয় ৷৷
কৃষ্ণভক্তি সম্পাদিত হলে অন্য সমস্ত কর্ম আপনা থেকে করা হয়ে যায়; এই সুদৃঢ় বিশ্বাসকে বলা হয় শ্রদ্ধা । [সনাতন শিক্ষা]
ইন্দ্রিয় সংযম
চৈঃ চঃ অন্ত্য ৫.১৯
কাষ্ঠ-পাষাণ-স্পর্শে হয় যৈছে ভাব ।
তরুণী-স্পর্শে রামানন্দের তৈছে ‘স্বভাব' ৷৷
কাঠ এবং পাথর স্পর্শ করলে যেমন সাধারণ মানুষের মনে কোন বিকার হয় না, তেমনই তরুণীর দেহ স্পর্শ করে রামানন্দ রায়ের মনে কোন বিকার হল না । [রামানন্দ রায়ের দেবকন্যাদের স্নান ও শৃঙ্গারাদি করানো সত্ত্বেও অবিচলতা]
পূর্বতন আচার্যদের অনুসরণ
চৈঃ চঃ অন্ত্য ৭.১৫
প্ৰভু হাসি' কহে,—“স্বামী না মানে যেই জন ।
বেশ্যার ভিতরে তারে করিয়ে গণন ॥’
শ্রীচৈতন্য মহপ্রভু হেসে উত্তর দিলেন, “যে তার স্বামীকে মানে না, তাকে আমি বেশ্যা বলে মনে করি ।”
[বল্লভ-ভট্টাচার্যের প্রতি মহাপ্রভু
সেবাভাব
চৈঃ চঃ অন্ত্য ১০.৯৬
‘সেবা’ লাগি কোটি ‘অপরাধ' নাহি গণি ।
স্ব-নিমিত্ত ‘অপরাধাভাসে' ভয় মানি ৷
ভগবানের সেবা করতে গিয়ে যদি আমার কোটি অপরাধ ও হয়, তার আমি কোন গুরুত্ব দিই না, কিন্তু নিজের সুখের জন্য অপরাধের আভাসকেও আমি ভয় করি ।
[একদিন মহাপ্রভু গম্ভীরার দ্বার রুদ্ধ করে শয়ন করলে তাঁর পাদ- সম্বাহন করার জন্য তাঁর সেবক গোবিন্দ তাঁকে অতিক্রম করে যান, কিন্তু পাদ-সম্বাহন সমাপন করে সেখানেই অবস্থান করেন । পরবর্তীতে মহাপ্রভু জেগে উঠে তাঁকে জিজ্ঞাসা করেন যে, তিনি কেন তখনও সেখানে বসে আছেন । গোবিন্দ তখন মহাপ্রভুকে বললেন যে, মহাপ্রভু দ্বার রুদ্ধ করে শয়ন করে আছেন । তখন মহাপ্রভু পুনরায় জিজ্ঞাসা করলেন যে, মন্দিরে প্রবেশের সময় তিনি যেভাবে মহাপ্রভুকে অতিক্রম করেছিলেন, সেখান থেকে বহির্গমনকালে কেন একইভাবে অতিক্রম করেননি ? এর উত্তরে গোবিন্দ এই পদ্যটি বললেন]
গ্রাম্যবার্তা এবং বৈষ্ণব নিন্দা পরিহার; সবাইকে ভক্তরূপে দর্শন
চৈঃ চঃ অন্ত্য ১৩.১৩২-১৩৩
গ্রাম্যবার্তা না শুনে, না কহে জিহ্বায় ৷
কৃষ্ণকথা-পূজাদিতে অষ্টপ্রহর যায় ৷
বৈষ্ণবের নিন্দ্য-কর্ম নাহি পাড়ে কাণে ৷
সবে কৃষ্ণ ভজন করে,—এইমাত্র জানে ৷
রঘুনাথ ভট্ট কোন রকম জড় জাগতিক কথাবার্তা শুনতেন না বা জিহ্বায় উচ্চারণ করতেন না। কৃষ্ণকথা এবং কৃষ্ণ-পূজায় তাঁর অষ্টপ্রহর অতিবাহিত হত । তিনি কখনও বৈষ্ণবের নিন্দা কানে শুনতেন না, অথবা বৈষ্ণবের অন্যায় আচরণের কথা শুনতেন না । তিনি জানতেন যে সকলেই শ্রীকৃষ্ণের ভজন করছেন । [রঘুনাথ ভট্টের গুণাবলী]
ভগবানকে দর্শনের আর্তি
চৈঃ চঃ অন্ত্য ১৪.২৮-২৯
তার আর্তি দেখি” প্রভু কহিতে লাগিলা ৷
এত আর্তি জগন্নাথ মোরে নাহি দিলা ॥
জগন্নাথে আবিষ্ট ইহার তনু-মন-প্রাণে ।
মোর স্কন্ধে পদ দিয়াছে, তাহা নাহি জানে ॥
সেই রমণীটির আর্তি দেখে শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু বলতে লাগলেন, “এত আৰ্তি শ্ৰীজগন্নাথদেব আমাকে দিলেন না । তার দেহ, মন এবং প্রাণ শ্রীজগন্নাথদেবের দর্শনে এতই আবিষ্ট যে, আমার কাঁধে পা দিয়েছে সে সম্বন্ধে তার কোন চেতনাই নাই ।” [জগন্নাথ মন্দিরে এক স্ত্রী জগন্নাথ দর্শনের জন্য মহাপ্রভুর কাধে পা দিয়ে গরুড়স্তম্ভে আরোহণ করেন । তখন মহাপ্রভুর সেবক গোবিন্দ সেই স্ত্রীকে নিষেধ করতে গেলে মহাপ্রভু তাঁকে বারণ করেন এবং জগন্নাথ দর্শনের জন্য সেই বৃদ্ধার উৎকণ্ঠ ভাবের প্রশংসা করলেন । ]
বৈষ্ণব সদাচার -সমালোচনার ভয়
চৈঃ চঃ অন্ত্য ৮.১
তং বন্দে কৃষ্ণচৈতন্যং রামচন্দ্রপুরীভয়াৎ।
লৌকিকাহারতঃ স্বং যো ভিক্ষান্নং সমকোচয়ৎ ৷৷
আমি শ্ৰীকৃষ্ণচৈতন্য মহাপ্রভুকে বন্দনা করি, যিনি রামচন্দ্রপুরীর সমালোচনা ভয়ে তাঁর আহারের মাত্রা হ্রাস করেছিলেন।
ভক্তদের মধ্যে বড়-ছোট ভেদ
চৈঃ চঃ আদি ১০.৫
যত যত মহান্ত কৈলা তাঁ-সবার গণন ৷
কেহ করিবারে নারে জ্যেষ্ঠ-লঘু-ক্রম ৷৷
সমস্ত মহান ব্যক্তিরা তাঁদের গণনা করলেন, কিন্তু কেউ বিচার করতে পারলেন না কে বড় এবং কে ছোট ।
বহুশাস্ত্রাভ্যাস বর্জনীয়
চৈঃ চঃ আদি ১৬.১১
বহুশাস্ত্রে বহুবাক্যে চিত্তে ভ্রম হয়।
সাধ্য-সাধন শ্রেষ্ঠ না হয় নিশ্চয় ৷৷
কেউ যদি বই-এর পোকার মতো বহু গ্রন্থ বা বহু শাস্ত্র পাঠ করে, বহু ভাষ্য শ্রবণ করে এবং বহু মানুষের নির্দেশ গ্রহণ করে, তা হলে তার চিত্ত বিভ্রান্ত হয়ে পড়ে এবং সে জীবনের প্রকৃত উদ্দেশ্য সাধনের পন্থা নির্ণয় করতে পারে না । [পূর্ববঙ্গে তপন মিশ্র নামে এক ব্রাহ্মণ ছিলেন, যিনি সাধ্য-সাধন নির্ণয় করতে সমর্থ হননি
বিজাতীয় সঙ্গে ভাব সংবরণ
চৈঃ চঃ মধ্য ৮.২৮
এইমত বিপ্রগণ ভাবে মনে মন ৷
বিজাতীয় লোক দেখি, প্রভু কৈল সম্বরণ ৷
শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু এবং রামানন্দ রায়ের আচরণ দর্শন করে বৈদিক ব্রাহ্মণেরা যখন এইভাবে চিন্তা করছিলেন, তখন বিজাতীয় লোক দেখে শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু তাঁর ভাব সংবরণ করলেন।
[গোদাবরী নদীর তীরে মহাপ্রভু ও রামানন্দ রায়ের প্রথম সাক্ষাতের প্রাক্কালে]
‘অতিস্তুতি’ পরিহার
চৈঃ চঃ মধ্য ১০.১৮
প্রভু কহে, – ‘বিষ্ণু' ‘বিষ্ণু’, কি কহ সার্বভৌম ।
‘অতিস্তুতি' হয় এই নিন্দার লক্ষণ ৷৷
শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু বললেন, “সার্বভৌম ভট্টাচার্য, আপনি কি বলছেন? ‘শ্রীবিষ্ণু' আমাকে রক্ষা করুন ! এই ধরনের ‘অতিস্তুতি’ নিন্দারই নামান্তর।” [মহাপ্রভু এবং ব্রহ্মানন্দ ভারতীর মধ্যবর্তী মধুর বিতর্ক নিরসনার্থে সার্বভৌম ভট্টাচার্য মহাপ্রভুর মহিমা কীর্তন করলে মহাপ্রভুর প্রত্যুত্তর]
সন্ন্যাসীর সাবধানতা অবলম্বন
চৈঃ চঃ মধ্য ১২.৫১
শুক্লবস্ত্রে মসি-বিন্দু যৈছে না লুকায় ৷
সন্ন্যাসীর অল্প ছিদ্র সর্বলোকে গায় ৷
“সাদা কাপড়ে যেমন কালির দাগ লুকায় না, তেমনই সন্ন্যাসীর আচরণে অল্পদোষ দেখলেই লোকেরা সে কথা বলাবলি করে।” [মহারাজ প্রতাপরুদ্রকে দর্শন প্রদানের জন্য রামানন্দ রায় মহাপ্রভুকে অনুরোধ করলে মহাপ্রভুর উত্তর]
ধর্ম-স্থাপনই সাধুর ব্যবহারের উদ্দেশ্য
চৈঃ চঃ মধ্য ১৭.১৮৪ ১৮৫
প্রভু কহে,—“শ্রুতি, স্মৃতি, যত ঋষিগণ ।
সবে ‘এক’-মত নহে, ভিন্ন ভিন্ন ধৰ্ম ৷
ধর্ম-স্থাপন-হেতু সাধুর ব্যবহার ৷
পুরী-গোসাঞির যে আচরণ, সেই ধর্ম সার ॥”
শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু বললেন, “বেদ পুরাণ এবং সমস্ত ঋষিরা সর্বদা এক মত নন । তার ফলে ভিন্ন ভিন্ন ধর্মের সৃষ্টি হয়েছে । যথার্থ সাধু বা ভক্ত তাদের আচরণের মাধ্যমে প্রকৃত ধর্মের তত্ত্ব স্থাপন করেন । শ্রীল মাধবেন্দ্রপুরী যেভাবে আচরণ করে গেছেন সেইটিই হচ্ছে ধর্মের সার।” [সানোড়িয়া ব্রাহ্মণের প্রতি মহাপ্রভু]
জানা সত্ত্বেও প্রশ্ন করা
চৈঃ চঃ মধ্য ২০.১০৫
কৃষ্ণশক্তি ধর তুমি, জান তত্ত্বভাব ৷
জানি' দার্ঢ্য লাগি' পুছে, সাধুর স্বভাব ৷
তুমি শ্রীকৃষ্ণের শক্তি ধর, তাই তুমি এই সমস্ত তত্ত্ব জান । কিন্তু কঠোরতার জন্য, নিজে জানা সত্ত্বেও, সাধুর স্বভাব হচ্ছে প্রশ্ন করা । [সনাতন শিক্ষা]
শুদ্ধভক্তের ব্যবহার বিজ্ঞেরও বোধগম্যতার অতীত
চৈঃ চঃ মধ্য ২৩.৩৯
যাঁর চিত্তে কৃষ্ণ-প্রেম করয়ে উদয় ৷
তাঁর বাক্য, ক্রিয়া, মুদ্রা বিজ্ঞে না বুঝয় ।।
যাঁর চিত্তে কৃষ্ণপ্রেমের উদয় হয়, তাঁর কথা-বার্তা, কার্যকলাপ এবং আচার-আচরণ বিজ্ঞেরাও বুঝতে পারে না । [সনাতন শিক্ষা]
মর্যাদা-পালন হয় সাধুর ভূষণ
চৈঃ চঃ অন্ত্য ৪.১২৯-১৩০
যদ্যপিও তুমি হও জগৎপাবন ।
তোমা-স্পর্শে পবিত্র হয় দেব-মুনিগণ ৷
তথাপি ভক্ত-স্বভাব—মর্যাদা-রক্ষণ।
মর্যাদা-পালন হয় সাধুর ভূষণ ৷
যদিও তুমি জগৎপাবন; যদিও তোমার স্পর্শে দেবতা এবং মুনিরাও পবিত্র হয়; তবুও ভক্তের স্বভাব হচ্ছে মর্যাদা রক্ষা করা । মর্যাদা পালন সাধুর অঙ্গের ভূষণ । [সনাতন গোস্বামীর প্রতি মহাপ্রভু]
মর্যাদা লঙ্ঘনের পরিণাম
চৈঃ চঃ অন্ত্য 8.135
মর্যাদা-লঙ্ঘনে লোক করে উপহাস ।
ইহলোক, পরলোক—দুই হয় নাশ ৷৷
কেউ যদি মর্যাদা লঙ্ঘন করে তাহলে লোকে তাকে উপহাস করে, এবং তার ফলে তার ইহলোক এবং পরলোক উভয়ই নাশ হয় । [সনাতন গোস্বামীর প্রতি মহাপ্রভু]
মর্যাদা পালনের পরিণাম
চৈঃ চঃ অন্ত্য 8.135
মর্যাদা রাখিলে, তুষ্ট কৈলে মোর মন ।
তুমি ঐছে না করিলে করে কোন্ জন?
এইভাবে মর্যাদা রক্ষা করে তুমি আমাকে অত্যন্ত সন্তুষ্ট করলে । তুমি ছাড়া আর কে এইরকম দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে পারে ? [সনাতন গোস্বামীর প্রতি মহাপ্রভু]
ইতিবাচকতা
চৈঃ চঃ আদি ১৭.৬২-৬৩
শাপিব তোমারে মুঞি, পাঞাছি মনোদুঃখ।
পৈতা ছিণ্ডিয়া শাপে প্ৰচণ্ড দুমুখ ৷৷
সংসার-সুখ তোমার হউক বিনাশ ।
শাপ শুনি' প্রভুর চিত্তে হইল উল্লাস ৷
সেই প্রচণ্ড দুর্মুখ ব্রাহ্মণ তাঁকে বললেন, “আমি মনে দুঃখ পেয়েছি, তাই আমি তোমাকে অভিশাপ দেব।” এই বলে তিনি তাঁর পৈতা ছিঁড়ে তাঁকে অভিশাপ দিলেন। সেই ব্রাহ্মণ মহাপ্রভুকে অভিশাপ দিলেন, “তোমার সংসার-সুখ বিনষ্ট হোক ।” সেই শাপ শুনে মহাপ্রভু অন্তরে অত্যন্ত উল্লসিত হলেন ।
[শ্রীবাস গৃহে রাত্রিকালে সংকীর্তন লীলায় প্রবেশে ব্যর্থ হয়ে পরদিন এক ব্রাহ্মণ গঙ্গাতীরে মহাপ্রভুকে অভিশাপ দেয়]
বৈষ্ণব অপরাধ
একের দোষে দেশের দণ্ড
চৈঃ চঃ অন্ত্য 3.168
মহান্তের অপমান যে দেশ-গ্রামে হয় ৷
এক জনার দোষে সব দেশ উজাড়য় ৷৷
যেখানেই মহান ভগবদ্ভক্তের অপমান হয়, সেখানে একজনের দোষে সমস্ত দেশ উজাড় হয়ে যায় । [হরিদাস ঠাকুরের প্রতি অপরাধের জন্য রামচন্দ্র খাঁনের গ্রাম উজাড় হয়ে যায়]
মত্ত হস্তি
চৈঃ চঃ মধ্য ১৯.১৫
যদি বৈষ্ণব-অপরাধ উঠে হাতী মাতা ।
উপাড়ে বা চিণ্ডে, তার শুখি’ যায় পাতা ৷৷
ভগবদ্ভক্ত যদি এই জড় জগতে ভক্তিলতার সেবা করার সময় কোন বৈষ্ণবের চরণে অপরাধ করেন, তাহলে ভক্তিলতার পাতা শুকিয়ে যায় । এই প্রকার বৈষ্ণব-অপরাধকে মত্ত হস্তীর আচরণের সঙ্গে তুলনা করা হয়েছে । [রূপ শিক্ষা]
ভক্ত নিজের প্রতি অপরাধ গ্রহণ না করলেও ভগবান তা গ্রহণ করেন
চৈঃ চঃ অন্ত্য ৩.২১২ ২১৩
যদ্যপি হরিদাস বিপ্রের দোষ না লইলা ।
তথাপি ঈশ্বর তারে ফল ভুঞ্জাইলা ৷৷
ভক্ত-স্বভাব, অজ্ঞ-দোষ ক্ষমা করে।
কৃষ্ণ-স্বভাব, • ভক্ত-নিন্দা সহিতে না পারে ৷৷
যদিও হরিদাস ঠাকুর, বৈষ্ণবোচিত সহনশীলতার ফলে, সেই ব্রাহ্মণের অপরাধ গ্রহণ করেন নি, কিন্তু পরমেশ্বর ভগবান তা সহ্য করতে পারলেন না, এবং তাই তিনি তাকে এই অপরাধের দণ্ড দান করলেন । শুদ্ধ ভক্তের স্বভাব হচ্ছে যে তিনি অজ্ঞান মানুষের সমস্ত অপরাধ ক্ষমা করেন, কিন্তু কৃষ্ণের স্বভাব—তিনি ভক্তের নিন্দা সহ্য করতে পারেন না । [হরিদাস ঠাকুরের প্রতি গোপাল চক্রবর্তীর অপরাধ]
মহৎ-কৃপা
মহৎ-কৃপার গুরুত্ব কি?
চৈঃ চঃ মধ্য ২২.৫১
মহৎ-কৃপা বিনা কোন কর্মে ‘ভক্তি' নয়।
কৃষ্ণভক্তি দূরে রহু, সংসার নহে ক্ষয় ॥
“শুদ্ধ ভক্তের কৃপা ব্যতীত ভগবদ্ভক্তি লাভ করা সম্ভব নয় । কৃষ্ণভক্তি ত দূরের কথা, তার সংসার বন্ধনও মোচন হয় না ।” [সনাতন শিক্ষা]
বৈষ্ণবে প্রীতি
চৈঃ চঃ মধ্য ১১.২6-59
প্ৰভু কহে, - তুমি কৃষ্ণ-ভকতপ্রধান
তোমাকে যে প্রীতি করে, সেই ভাগ্যবান্ ॥
তোমাতে যে এত প্রীতি হইল রাজার ।
এই গুণে কৃষ্ণ তাঁরে করিবে অঙ্গীকার ॥
শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু বললেন, “রামানন্দ রায়, তুমি সর্বশ্রেষ্ঠ কৃষ্ণভক্ত; তাই তোমাকে যে প্রীতি করে সেই ভাগ্যবান । যেহেতু রাজা তোমার প্রতি এত প্রীতিপরায়ণ; তাই কৃষ্ণ অবশ্যই তাঁকে অঙ্গীকার করবেন।” [রামানন্দ রায়ের প্রতি মহারাজ প্রতাপরুদ্রের প্রীতিপরায়ণতার কথা রামানন্দ মহাপ্রভুর কাছে বর্ণনা করলে মহাপ্রভু অত্যন্ত প্রসন্ন হয়ে বলতে লাগলেন]
তিন মহাবল
চৈঃ চঃ অন্ত্য ১৬.৬০-৬৩
ভক্তপদধূলি আর ভক্তপদ-জল । ভক্তভুক্ত-অবশেষ, তিন মহাবল ৷৷ এই তিন-সেবা হইতে কৃষ্ণপ্রেমা হয় । পুনঃ পুনঃ সর্বশাস্ত্রে ফুকারিয়া কয় ।। তাতে বার বার কহি, - শুন ভক্তগণ । বিশ্বাস করিয়া কর এ-তিন সেবন ।। তিন হইতে কৃষ্ণনাম-প্রেমের উল্লাস ৷ কৃষ্ণের প্রসাদ, তাতে ‘সাক্ষী' কালিদাস ।।
ভক্তের পদধূলি, ভক্তের পা ধোয়া জল এবং ভক্তের ভুক্তাবশিষ্ট—এই তিনটি বস্তু মহাশক্তিশালী । এই তিনের সেবার ফলে কৃষ্ণপ্রেম লাভ হয় । সমস্ত শাস্ত্রে বারবার সে কথা উচ্চৈঃস্বরে ঘোষণা করা হয়েছে । তাই, হে ভক্তগণ, বিশ্বাস সহকারে এই তিনের সেবা করুন । এই তিনের প্রভাবে জীবনের পরম উদ্দেশ্য—কৃষ্ণ-প্রেম লাভ হয় । এইটিই শ্রীকৃষ্ণের সর্বশ্রেষ্ঠ প্রসাদ । তাঁর প্রমাণ কালিদাস স্বয়ং ।
কৃপা-যষ্টি
চৈঃ চঃ অন্ত্য ১.২
দুর্গমে পথি মেহন্ধস্য স্খলৎপাদগতেমূহুঃ। স্বকৃপা-যষ্টিদানেন সন্তঃ সৰ্ববলম্বনম্ ॥
সাধুগণ তাঁদের কৃপা-যষ্টি দান করে দুর্গম পথে মুহুর্মুহু স্খলিত পাদ এবং অন্ধস্বরূপ আমার অবলম্বন হউন।
ভক্তকৃপায় চৈতন্যলাভ
চৈঃ চঃ অন্ত্য ৩.১৭০
হরিদাস কৃপা করে তাঁহার উপরে ।
সেই কৃপা ‘কারণ’ হইল চৈতন্য পাইবারে ।।
হরিদাস ঠাকুরের বিশেষ কৃপা তাঁর উপর বর্ষিত হয়েছিল, এবং এই বৈষ্ণব কৃপার প্রভাবেই পরবর্তীকালে তিনি শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর শ্রীপাদপদ্মের আশ্রয় লাভ করেছিলেন । [হরিদাস ঠাকুর যখন চান্দপুর গ্রামে বলরাম আচার্যের গৃহে অবস্থান করছিলেন, তখন বালক রঘুনাথ দাস গোস্বামী সেখানে হরিদাস ঠাকুরকে দর্শন করতে আসতেন, এবং এভাবে তাঁর কৃপা প্ৰাপ্ত হন]
সাধুকৃপা বিনা প্রেম জন্মায় না
চৈঃ চঃ অন্ত্য ৩.২66
মায়া-দাসী ‘প্রেম’ মাগে, – ইথে কি বিষ্ময় ?
‘সাধুকৃপা’, ‘নাম’ বিনা ‘প্ৰেম’ না জন্মায় ৷৷
তাই কৃষ্ণদাসী মায়াদেবী যদি এই ‘প্রেম ভিক্ষা করেন, তাতে বিস্মিত হবার কি আছে ? শুদ্ধভক্তের কৃপা এবং ভগবানের নামকীর্তন ব্যতীত ভগবৎ-প্রেম লাভ করা যায় না । [হরিদাস ঠাকুরের নিকট মায়াদেবীর কৃষ্ণপ্রেম ভিক্ষা
বৈষ্ণবে বিশ্বাস
চৈঃ চঃ অন্ত্য ১৬.৪৮-৪৯
সর্বজ্ঞ-শিরোমণি চৈতন্য ঈশ্বর ।
বৈষ্ণবে তাঁহার বিশ্বাস, জানেন অন্তর ॥
সেইগুণ লঞা প্রভু তাঁরে তুষ্ট হইলা ।
অন্যের দুর্লভ প্রসাদ তাঁহারে করিলা ৷৷
শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু সর্বজ্ঞ-শিরোমণি পরমেশ্বর ভগবান, তাই তিনি জানতেন যে কালিদাস অন্তরে বৈষ্ণবদের প্রতি কত শ্রদ্ধা- পরায়ণ ছিলেন । তাঁর সেই গুণের ফলে, শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু তাঁর প্রতি অত্যন্ত সন্তুষ্ট হয়ে, অন্য সকলের দুর্লভ প্রসাদ তাঁকে দান করেছিলেন । [কালিদাসের মহাপ্রভুর চরণামৃত গ্রহণ
গুরু-শিষ্য -গুরুতত্ত্ব
চৈঃ চঃ আদি ১.৪৪
যদ্যপি আমার গুরু – চৈতন্যের দাস ।
তথাপি জানিয়ে আমি তাঁহার প্রকাশ ॥
যদিও আমি জানি যে, আমার গুরুদেব হচ্ছেন শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর দাস, তবুও তিনি হচ্ছেন শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর প্রকাশ । ।
চৈঃ চঃ আদি ১.৪৫
গুরু কৃষ্ণরূপ হন শাস্ত্রের প্রমাণে ।
গুরুরূপে কৃষ্ণ কৃপা করেন ভক্তগণে ৷৷
শাস্ত্রের প্রমাণ অনুসারে শ্রীগুরুদেব শ্রীকৃষ্ণ থেকে অভিন্ন । গুরুরূপে শ্রীকৃষ্ণ তাঁর ভক্তদের কৃপাপূর্বক উদ্ধার করেন ।
শিক্ষাগুরু তত্ত্ব
চৈঃ চঃ আদি ১.৪৭
শিক্ষাগুরুকে ত' জানি কৃষ্ণের স্বরূপ ৷
অন্তর্যামী, ভক্তশ্রেষ্ঠ, – এই দুই রূপ ৷
শিক্ষাগুরুকে পরমেশ্বর ভগবান শ্রীকৃষ্ণের স্বরূপ বলে জানতে হবে। শ্রীকৃষ্ণ নিজেকে অন্তর্যামী পরমাত্মারূপে ও শ্রেষ্ঠ ভক্তরূপে প্রকাশ করেন ।
চৈঃ চঃ আদি ১.৫৮
জীবে সাক্ষাৎ নাহি তাতে গুরু চৈত্ত্যরূপে ।
শিক্ষাগুরু হয় কৃষ্ণ মহান্তস্বরূপে ৷৷
যেহেতু সাক্ষাৎভাবে পরমাত্মার উপস্থিতি অনুভব করা যায় না, তাই তিনি নিত্যমুক্ত ভগবদ্ভক্তরূপে আমাদের সামনে আবির্ভূত হন । এই গুরুদেব হচ্ছেন শ্রীকৃষ্ণেরই অভিন্ন বিগ্রহ ।
আচার্যের মতই সার
চৈঃ চঃ আদি ১২.১০
আচার্যের মত যেই, সেই মত সার।
তাঁর আজ্ঞা লঙ্ঘি' চলে, সেই ত' অসার ৷
আচার্যের যে মত, সেই মতই হচ্ছে সার । যে সেই মত লঙ্ঘন করে, সে তৎক্ষণাৎ অসার হয়ে যায় ।
গুরুদেবের যোগ্যতা
চৈঃ চঃ মধ্য ৮.১২৮
কিবা বিপ্ৰ, কিবা ন্যাসী শূদ্র কেনে নয় ।
যেই কৃষ্ণতত্ত্ববেত্তা, সেই ‘গুরু’ হয় ৷
যিনি কৃষ্ণতত্ত্ববেত্তা তিনিই ‘গুরু’, তা তিনি ব্রাহ্মণ হোন, কিম্বা সন্ন্যাসীই হোন অথবা শূদ্রই হোন,তাতে কিছু যায় আসে না । [রামানন্দ রায়ের প্রতি মহাপ্রভু]
সদগুরুর আচরণ বিধি
চৈঃ চঃ আদি ১২.৫০-৫১
প্রতিগ্রহ কভু না করিবে রাজধন ।
বিষয়ীর অন্ন খাইলে দুষ্ট হয় মন ৷৷
মন দুষ্ট হইলে নহে কৃষ্ণের স্মরণ ।
কৃষ্ণস্মৃতি বিনু হয় নিষ্ফল জীবন ৷৷
আমার গুরুদেব শ্রীঅদ্বৈত আচার্য কখনই ধনী ব্যক্তি বা রাজার কাছ থেকে দান গ্রহণ করেননি । কারণ, গুরু যদি বিষয়ীর কাছ থেকে অন্ন অথবা অর্থ গ্রহণ করেন, তা হলে তাঁর মন দুষ্ট হয় । মন কলুষিত হলে কৃষ্ণকে স্মরণ করা যায় না; আর কৃষ্ণস্মৃতি যদি ব্যাহত হয়, তা হলে জীবন নিষ্ফল হয় । [অদ্বৈত আচার্যের সেবক কমলাকান্ত বিশ্বাসের প্রতি মহাপ্রভু]
গুরু আজ্ঞা হয় বলবান্
চৈঃ চঃ মধ্য ১০.১88
ভট্ট কহে,—গুরুর আজ্ঞা হয় বলবান্ ।
গুরু-আজ্ঞা না লঙ্ঘিয়ে, শাস্ত্ৰ – প্ৰমাণ ৷৷
সার্বভৌম ভট্টাচার্য বললেন, “গুরুদেবের আদেশ সবচাইতে বলবান, তাই গুরুদেবের আদেশ কখনই লঙ্ঘন করা যায় না । এটিই শাস্ত্র প্রমাণ।” [মহাপ্রভু স্বীয়গুরুভ্রাতা গোবিন্দকে ব্যক্তিসেবায় নিযুক্ত করতে দ্বিধান্বিত ছিলেন, কিন্তু তাঁর গুরুদেব ঈশ্বর পুরী স্বয়ং গোবিন্দকে আজ্ঞা দিয়েছেন মহাপ্রভুর সেবা করতে । তখন মহাপ্রভু সার্বভৌম ভট্টাচার্যের কাছে এর সমাধান জিজ্ঞাসা করলে সার্বভৌম ভট্টাচার্যের উত্তর]
গুরু কে?
চৈঃ চঃ মধ্য ১৫.১১৭
শুনি’ হর্ষে কহে প্ৰভু—“কহিলে নিশ্চয়।
যাঁহা হৈতে কৃষ্ণভক্তি সেই গুরু হয়” ॥
সেই কথা শুনে শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু বললেন, “হ্যাঁ, তুমি যা বলেছ তাই ঠিক । যার কাছ থেকে কৃষ্ণভক্তি লাভ হয়, তিনিই হচ্ছেন গুরু। ” [মহাপ্রভু শ্রীখণ্ডের রঘুনন্দনের পিতা মুকুন্দ দাস প্রশ্ন করলেন, “কে পিতা ? তিনি না রঘুনন্দন ? উত্তরে মুকুন্দ দাস বললেন যে, “রঘুনন্দনই হচ্ছে পিতা এবং আমি তার পুত্র।”]
ভগবানের কৃপার প্রকাশ
চৈঃ চঃ মধ্য ২২.৪৭
কৃষ্ণ যদি কৃপা করে কোন ভাগ্যবানে ৷
গুরু-অন্তর্যামি-রূপে শিখায় আপনে ॥
চৈত্যগুরুরূপে শ্রীকৃষ্ণ সকলেরই হৃদয়ে বিরাজমান । তিনি যখন কোন ভাগ্যবান ব্যক্তিকে কৃপা করেন, যেন তিনি স্বয়ং তাকে, বাহিরে গুরুরূপে এবং অন্তরে অন্তর্যামীরূপে ভগবদ্ভক্তির শিক্ষা দান করেন । [সনাতন শিক্ষা]
গুরুদেবের কাছে প্রশ্ন করা এবং শ্রবণ করা
চৈঃ চঃ মধ্য 25.155
সর্ব-দেশ-কাল-দশায় জনের কর্তব্য ।
গুরু-পাশে সেই ভক্তি প্ৰষ্টব্য, শ্রোতব্য ॥
তাই সমস্ত দেশের, সমস্ত কালের, সমস্ত অবস্থায় প্রতিটি মানুষের কর্তব্য সদ্গুরুর শরণাগত হয়ে সেই ভক্তি সম্বন্ধে প্রশ্ন করা এবং নিষ্ঠা সহকারে শ্রবণ করা। [প্রকাশানন্দ সরস্বতীর প্রতি মহাপ্রভু
দীক্ষা
চৈঃ চঃ অন্ত্য ৪.195
দীক্ষাকালে ভক্ত করে আত্মসমর্পণ ।
সেইকালে কৃষ্ণ তারে করে আত্মসম ॥
দীক্ষার সময়, ভক্ত যখন নিজেকে সর্বতোভাবে শ্রীকৃষ্ণের সেবায় উৎসর্গ করেন, তখন শ্রীকৃষ্ণ তাকে নিজের বলে গ্রহণ করেন । [হরিদাস ঠাকুর এবং সনাতন গোস্বামীর প্রতি মহাপ্ৰভু
গুরুদেব কর্তৃক উপেক্ষিত হবার ফল
চৈঃ চঃ অন্ত্য ৮.৯৯
গুরু উপেক্ষা কৈলে, ঐছে ফল হয় ।
ক্রমে ঈশ্বর পর্যন্ত অপরাধে ঠেকয়।।
গুরুদেব যদি কাউকে পরিত্যাগ করেন, তাহলে এরকমই ফল হয়—রামচন্দ্রপুরীর মতো, অবশেষে ভগবানের চরণে গিয়ে সেই অপরাধ ঠেকে। [ঈশ্বর পুরী এবং মহাপ্রভুর প্রতি রামচন্দ্র পুরীর অপরাধ]
গুরুদেব শিষ্যকে পরীক্ষা করেন
চৈঃ চঃ অন্ত্য ৪.১
বৃন্দাবনাৎ পুনঃ প্রাপ্তং শ্রীগৌরঃ শ্রীসনাতনম্ ।
দেহপাতাদবন্ স্নেহাৎ শুদ্ধং চক্রে পরীক্ষয়া ৷৷
বৃন্দাবন থেকে আগত সনাতন গোস্বামীকে শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু স্নেহক্রমে দেহপাত থেকে উদ্ধার করে পরীক্ষা-পূর্বক শুদ্ধ করেছিলেন।
‘দাস’-অভিমান
কৃষ্ণপ্রেমের প্রভাব
চৈঃ চঃ আদি ৬.৫৩
কৃষ্ণপ্রেমের এই এক অপূর্ব প্রভাব ৷
গুরু-সম-লঘুকে করায় দাস্যভাস ॥
কৃষ্ণপ্রেমের এই এক অপূর্ব প্রভাব যে, তা গুরু, সম ও লঘু সকলকে শ্রীকৃষ্ণের প্রতি দাস্যভাবে আবিষ্ট করে ।
নিত্যানন্দ প্রভুর দাস্য-ভাব
চৈঃ চঃ আদি ৫. ১৩৭
আপনাকে ভৃত্য করি' কৃষ্ণে প্রভু জানে ৷
কৃষ্ণের কলার কলা আপনাকে মানে ৷৷
তিনি নিজেকে ভৃত্য বলে মনে করেন এবং শ্রীকৃষ্ণকে প্রভু বলে জানেন। এভাবেই তিনি নিজেকে শ্রীকৃষ্ণের কলার কলা বলে মনে করেন।
চৈঃ চঃ আদি ৬.৪৮
নিত্যানন্দ অবধূত সবাতে আগল ৷
চৈতন্যের দাস্য-প্রেমে হইলা পাগল ৷
শ্ৰীনিত্যানন্দ অবধূত শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর সমস্ত পার্ষদদের মধ্যে সর্বাগ্রগণ্য । তিনি শ্রীচৈতন্যের দাস্যপ্রেমে পাগল হয়েছিলেন ।
চৈঃ চঃ মধ্য ১.২৮
যদ্যপি আপনি হয়ে প্রভু বলরাম ।
তথাপি চৈতন্যের করে দাস-অভিমান ৷
যদিও শ্রীনিত্যানন্দ প্রভু স্বয়ং বলরাম, তবুও তিনি নিজেকে শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর দাস বলে মনে করতেন ।
চৈঃ চঃ মধ্য ১.২৯
‘চৈতন্য’ সেব, ‘চৈতন্য' গাও, লও ‘চৈতন্য’-নাম ৷
‘চৈতন্যে’ যে ভক্তি করে, সেই মোর প্রাণ ৷৷
শ্রীনিত্যানন্দ প্রভু সকলকে শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর সেবা করতে, শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর নাম গ্রহণ করতে, শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর মহিমা কীর্তন করতে অনুরোধ করেছিলেন । শ্রীনিত্যানন্দ প্রভু বলেছিলেন, “যে শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুকে ভক্তি করে, সে আমার প্রাণের মতো প্রিয় । ”
অদ্বৈত আচার্যের দাস্য-ভাব
চৈঃ চঃ আদি ৬.৪২-৪৩
চৈতন্যগোসাঞিকে আচার্য করে ‘প্রভু’-জ্ঞান।
আপনাকে করেন তাঁর ‘দাস’-অভিমান ৷
সেই অভিমান-সুখে আপনা পাসরে ৷
‘কৃষ্ণদাস’ হও—জীবে উপদেশ করে ॥
শ্রীঅদ্বৈত আচাৰ্য প্ৰভু কিন্তু শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুকে তাঁর প্রভু বলে মনে করেন এবং নিজেকে শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর দাস বলে মনে করেন । সেই অভিমানের আনন্দে তিনি সম্পূর্ণভাবে আত্মবিস্মৃত হন এবং সমস্ত জীবকে উপদেশ দেন, “তোমরা হচ্ছ শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর দাস ।”
সকলের দাস্যভাবে আনন্দ
চৈঃ চঃ আদি ৬.৪৭
দাস্য-ভাবে আনন্দিত পারিষদগণ ।
বিধি, ভব, নারদ আর শুক, সনাতন ॥
ব্রহ্মা, শিব, নারদ, শুক ও সনাতন আদি শ্রীকৃষ্ণের সমস্ত পার্যদেরা দাস্যভাবে আনন্দিত ।
সকলেই তাঁর দাস
চৈঃ চঃ আদি ৬.৮৫-৮৬
কেহ মানে, কেহ না মানে, সব তাঁর দাস।
যে না মানে, তার হয় সেই পাপে নাশ ৷৷
চৈতন্যের দাস মুঞি, চৈতন্যের দাস।
চৈতন্যের দাস মুঞি, তাঁর দাসের দাস ॥
কেউ তাঁকে মানে আবার কেউ তাঁকে মানে না, তবুও সকলেই তাঁর দাস। যে তাঁকে মানে না, সেই পাপে তার সর্বনাশ হয় । আমি শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর দাস, শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর দাস । আমি শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর দাস এবং তাঁর দাসের অনুদাস ।
কৃষ্ণপাদপদ্ম-গন্ধ
চৈঃ চঃ অন্ত্য ৬.১৩৬
কৃষ্ণপাদপদ্ম-গন্ধ যেই জন পায় ।
ব্রহ্মলোক-আদি-সুখ তাঁকে নাহি ভায় ॥
শ্রীকৃষ্ণের শ্রীপাদপদ্মের সৌরভ যে আঘ্রাণ করেছে, তার কাছে ব্রহ্মলোকের সুখও তুচ্ছ বলে মনে হয় ।
অনর্থ
কাম ও প্রেমের পার্থক্য
চৈঃ চঃ আদি ৪.১৬৪
কাম, প্রেম—দোঁহাকার বিভিন্ন লক্ষণ ।
লৌহ আর হেম যৈছে স্বরূপে বিলক্ষণ ॥
কাম ও প্রেমের লক্ষণ বিভিন্ন, ঠিক যেমন লোহার সঙ্গে সোনার পার্থক্য ।
চৈঃ চঃ আদি ৪.১৭১
অতএব কাম— প্রেমে বহুত অন্তর।
কাম—অন্ধতমঃ, প্রেম—নির্মল ভাস্কর ৷
তাই কাম ও প্রেমের মধ্যে এক বিরাট পার্থক্য রয়েছে। কাম হচ্ছে গভীরতম অন্ধকারের মতো, আর প্রেম সূর্যের মতো উজ্জ্বল।
কাম ও প্রেমের সংজ্ঞা
চৈঃ চঃ আদি ৪.১৬৫
আত্মেন্দ্রিয়প্রীতি-বাঞ্ছা—তারে বলি, ‘কাম’।
কৃষ্ণেন্দ্রিয়প্রীতি-ইচ্ছা ধরে ‘প্রেম’ নাম ৷৷
নিজের ইন্দ্রিয়-তৃপ্তির বাসনাকে বলা হয় কাম, আর শ্রীকৃষ্ণের ইন্দ্রিয়ের প্রীতি সাধনের ইচ্ছাকে বলা হয় প্ৰেম ।
কাষ্ঠ নির্মিত স্ত্রী মূর্তি
চৈঃ চঃ অন্ত্য ২.১১৮
দুর্বার ইন্দ্রিয় করে বিষয়-গ্ৰহণ ৷
দারবী প্রকৃতি হরে মুনেরপি মন ৷
ইন্দ্রিয়গুলি এমনই প্রবলভাবে ইন্দ্রিয়ের বিষয়ের প্রতি আসক্ত যে কাষ্ঠ নির্মিত স্ত্রী মূর্তি পর্যন্ত মুনিদের চিত্ত হরণ করে । [ছোট হরিদাসকে পরিত্যাগের কারণ সম্বন্ধে ভক্তগণ মহাপ্রভুকে জিজ্ঞাসা করলে মহাপ্রভুর উত্তর]
ছোট হরিদাসের দণ্ড থেকে ভক্তগণের
হৃদয়ে ত্রাস
চৈঃ চঃ অন্ত্য ২.১৪8
দেখি' ত্রাস উপজিল সব ভক্তগণে ।
স্বপ্নেহ ছাড়িল সবে স্ত্রী-সম্ভাষণে ৷
এই দৃষ্টান্ত দর্শন করে সমস্ত ভক্তদের হৃদয়ে ত্রাসের উদয় হল, এবং তারা স্বপ্নে পর্যন্তও স্ত্রী-সম্ভাষণ বর্জন করলেন । [ছোট হরিদাসের দণ্ড]
প্রতিষ্ঠা
চৈঃ চঃ মধ্য ৪.১৪৬ ১৪৭
প্রতিষ্ঠার স্বভাব এই জগতে বিদিত।
যে না বাঞ্ছে, তার হয় বিধাতা-নির্মিত ৷
প্রতিষ্ঠার ভয়ে পুরী গেলা পলাঞা ৷
কৃষ্ণ-প্রেমে প্রতিষ্ঠা চলে সঙ্গে গড়াঞা ।।
এটিই হচ্ছে প্রতিষ্ঠার স্বভাব—বিধাতা যাঁকে প্রতিষ্ঠা দিতে চান, তিনি না চাইলেও তাঁর খ্যাতি সারা জগৎ জুড়ে প্রচারিত হয় । প্রতিষ্ঠার ভয়ে মাধবেন্দ্র পুরী রেমুণা থেকে পালিয়ে গেলেন। কিন্তু ভগবৎ-প্রেম জনিত প্রতিষ্ঠার এমনই মহিমা যে, তা ভগবদ্ভক্তের সঙ্গে সঙ্গে চলে ।
মাৎসর্য
চৈঃ চঃ মধ্য ১৫.২98-595
সহজে নির্মল এই ‘ব্রাহ্মণ’-হৃদয় ।
কৃষ্ণের বসিতে এই যোগ্যস্থান হয় ৷৷
‘মাৎসর্য’-চণ্ডাল কেনে ইহা বসাইলে।
পরম পবিত্র স্থান অপবিত্ৰ কৈলে ॥
এই ব্রাহ্মণের হৃদয় স্বাভাবিক ভাবেই নির্মল; সেটি শ্রীকৃষ্ণের বসা উপযুক্ত স্থান, কিন্তু সেখানে কেন তুমি মাৎসর্যরূপ চণ্ডালকে বসালে? সেই পরম পবিত্র স্থানকে কেন এইভাবে অপবিত্র করলে? [সার্বভৌম ভট্টাচার্যের জামাতা অমোঘের প্রতি মহাপ্রভু]
বিষয় বাসনাকারী—মহামূর্খ
চৈঃ চঃ অন্ত্য ৯.৬৯
তোমার ভজন-ফলে তোমাতে ‘প্ৰেমধন' ৷
বিষয় লাগি' তোমায় ভজে, সেই মূৰ্খ জন ॥
কাশীমিশ্র আরও বললেন, “কেউ যখন আপনার সন্তুষ্টি বিধানের জন্য আপনার প্রতি সেবাপরায়ণ হন, তখন তিনি প্রেমরূপ মহাসম্পদ লাভ করেন । কিন্তু কেউ যদি জড় বিষয় লাভের আশায় আপনার সেবা করে, সে মহামূর্খ ।” [মহাপ্রভুর প্রতি কাশী মিশ্ৰ]
বৈরাগ্য বিদ্যা সমদৃষ্টি
চৈঃ চঃ অন্ত্য ৪.১৭৯
আমি ত’–সন্ন্যাসী, আমার ‘সম-দৃষ্টি’ ধর্ম।
চন্দন-পঙ্কেতে আমার জ্ঞান হয় ‘সম’৷৷
কিন্তু আমি সন্ন্যাসী, তাই আমার কর্তব্য সমদৃষ্টি সম্পন্ন হওয়া । চন্দনের প্রতি এবং পঙ্কের প্রতি আমি সমবুদ্ধি সম্পন্ন । [সনাতন গোস্বামীর প্রতি মহাপ্রভু]
মহাপ্রভুর ভক্তদের প্রধান বৈশিষ্ট্য
চৈঃ চঃ অন্ত্য ৬.২50
মহাপ্রভুর ভক্তগণের বৈরাগ্য প্রধান
যাহা দেখি” প্রীত হন গৌর-ভগবান্ ॥
শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর ভক্তরা বৈরাগ্য প্রধান, এবং তাদের সেই বৈরাগ্য দেখে পরমেশ্বর ভগবান শ্রীগৌরসুন্দর অত্যন্ত প্রীত হন । [রঘুনাথ দাস গোস্বামীর বৈরাগ্য প্রসঙ্গে]
মর্কট-বৈরাগ্য পরিত্যাজ্য; বৈরাগীর আভ্যন্তরীণ চেতনা ও বাহ্যিক আচরণ
চৈঃ চঃ মধ্য ১৬.২৩৮-২৩৯
মর্কট-বৈরাগ্য না কর লোক দেখাঞা।
যথাযোগ্য বিষয় ভুঞ্জ' অনাসক্ত হঞা ॥
অন্তরে নিষ্ঠা কর, বাহ্যে লোকব্যবহার ।
অচিরাৎ কৃষ্ণ তোমায় করিবেন উদ্ধার ॥
শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু রঘুনাথ দাসকে বললেন, “লোকের কাছে বাহবা পাবার জন্য কপট বৈরাগ্যের অভিনয় কর না; অনাসক্ত হয়ে যথাযোগ্য বিষয় ভোগ কর। অন্তরে নিষ্ঠাসহকারে ভগবানের সেবা কর, কিন্তু বাইরে একজন সাধারণ বিষয়ীর মতো আচরণ কর । তাহলে শ্রীকৃষ্ণ তোমার প্রতি অচিরেই সন্তুষ্ট হবেন এবং মায়ার বন্ধন থেকে তোমাকে উদ্ধার করবেন। [রঘুনাথ দাস গোস্বামীর প্রতি মহাপ্রভু রঘুনাথ দাস গোস্বামীর বৈরাগ্য প্রসঙ্গে গোবিন্দের প্রতি মহাপ্রভু নিম্নোক্ত শ্লোকগুলি বলে বৈরাগ্য ধর্মের আদর্শ মান স্থাপন করেন
বৈরাগীর নিত্য ও নৈমিত্তিক কর্ম
চৈঃ চঃ অন্ত্য ৬.২53
বৈরাগী করিবে সদা নাম-সঙ্কীর্তন ।
মাগিয়া খাঞা করে জীবন রক্ষণ ৷
বৈরাগী সর্বদা নাম-সংকীর্তন করবে, এবং ভিক্ষা করে জীবন ধারণ করবে।
চৈঃ চঃ অন্ত্য ৬.২56
বৈরাগীর কৃত্য—সদা নাম-সঙ্কীর্তন ৷
শাক-পত্র-ফল-মূলে উদর-ভরণ ॥
বৈরাগীর কর্তব্য—সর্বদা নাম-সংকীর্তন করা, এবং শাক-পাতা, ফল-মূল, যা পাওয়া যায় তাই দিয়ে উদর-ভরণ করা ।
পরনির্ভরশীল বৈরাগী কৃষ্ণ কর্তৃক উপেক্ষিত
চৈঃ চঃ অন্ত্য 6.558
বৈরাগী হঞা যেবা করে পরাপেক্ষা ।
কার্যসিদ্ধি নহে, কৃষ্ণ করেন উপেক্ষা ৷৷
বৈরাগী হয়ে যে পরের উপর নির্ভর করে, তার কার্যসিদ্ধি হয় না, এবং কৃষ্ণ তাকে উপেক্ষা করেন ।
জিহ্বার লালসা অবশ্য পরিত্যাজ্য
চৈঃ চঃ অন্ত্য ৬.২৫
বৈরাগী হঞা করে জিহ্বার লালস ।
পরমার্থ যায়, আর হয় রসের বশ ॥
বৈরাগী হয়ে কেউ যদি জিহ্বার লালসা করে, তাহলে তার পরমার্থ সাধন হয় না, এবং সে জিহ্বার রসের বশবর্তী হয় ।
জিহ্বা-শিশ্ন-উদর দমন
চৈঃ চঃ অন্ত্য 6.559
জিহ্বার লালসে যেই ইতি-উতি ধায় ৷
শিশ্নোদরপরায়ণ কৃষ্ণ নাহি পায় ৷৷
জিহ্বার লালসে যে এদিকে ওদিকে ঘুরে বেড়ায়, সেই শিশ্নোদর- পরায়ণ ব্যক্তি কখনও কৃষ্ণকে পায় না ।
বাহ্যিক নিষেধ ও আভ্যন্তরীণ বিধি
চৈঃ চঃ অন্ত্য 6.136-537
গ্রাম্যকথা না শুনিবে, গ্রাম্যবার্তা না কহিবে।
ভাল না খাইবে আর ভাল না পরিবে ৷৷
অমানী মানদ হঞা কৃষ্ণনাম সদা ল’বে ।
ব্রজে রাধাকৃষ্ণ-সেবা মানসে করিবে ৷
জড় জাগতিক বিষয় নিয়ে আলোচনা করবে না, এবং সেই সমস্ত বিষয়ে শ্রবণ করবে না। ভাল খাবার খাবে না এবং ভাল কাপড় পরবে না । নিজে কোন রকম সম্মানের প্রত্যাশা না করে অন্য সকলকে যথাযোগ্য সম্মান প্রদর্শন করে সর্বদা কৃষ্ণনাম গ্রহণ করবে, এবং মানসে বৃন্দাবনে রাধাকৃষ্ণের সেবা করবে । [রঘুনাথ দাস গোস্বামীর প্রতি মহাপ্রভু]
বিষয়ীর অন্ন
চৈঃ চঃ অন্ত্য ৬.২48-599
বিষয়ীর অন্ন খাইলে মলিন হয় মন।
মলিন মন হৈলে নহে কৃষ্ণের স্মরণ ।
বিষয়ীর অন্ন হয় ‘রাজস' নিমন্ত্রণ ৷
দাতা, ভোক্তা—দুহার মলিন হয় মন ৷৷
বিষয়ীর অন্ন গ্রহণ করলে মন কলুষিত হয়, এবং মন কলুষিত হলে যথাযথভাবে শ্রীকৃষ্ণকে স্মরণ করা যায় না। বিষয়ীর অন রজোগুণের দ্বারা প্রভাবিত, তাই বিষয়ীর নিমন্ত্রণ গ্রহণ করলে, দাতা এবং ভোক্তা দুজনেরই মন মলিন হয় । [মহাপ্রভুর উক্তি]
কৃষ্ণকথার মাহাত্ম্য
কৃষ্ণকথার অমৃত ধারা
চৈঃ চঃ আদি ২.২
কৃষ্ণোৎকীর্তনগাননর্তনকলাপাথোজনি-ভ্রাজিতা
সদ্ভক্তাবলিহংসচক্রমধুপশ্রেণীবিহারাস্পদম্ ।
কর্ণানন্দিকলধ্বনির্বহতু মে জিহ্বামরূপ্রাঙ্গণে
শ্রীচৈতন্যদয়ানিধে তব লসল্লীলাসুধাস্বধুনী ॥
হে দয়ার সমুদ্র শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু, গঙ্গার অমৃতময় ধারাসদৃশ আপনার অপ্রাকৃত লীলামৃত আমার মরুভূমি-সদৃশ জিহ্বায় প্রবাহিত হোক । এই অমৃতের ধারাকে পরিশোভিত করেছে গান, উচ্চ সংকীর্তন ও নর্তনরূপ পদ্মসমূহ, যা শুদ্ধ ভক্তমণ্ডলীরূপ হংস, চক্রবাক ও ভ্রমরসমূহের বিহারস্থল। এই অমৃতরূপ নদীর প্রবাহ এক মধুর ধ্বনি সৃষ্টি করছে, যা তাঁদের শ্রবণযুগলের পক্ষে পরম আনন্দদায়ক ।
অনন্তশেষের নিরন্তর কৃষ্ণ কথা গান
চৈঃ চঃ আদি ৫.১২-১১
সেই ত’ ‘অন্তত’ ‘শেষ’— ভক্ত অবতার ।
ঈশ্বরের সেবা বিনা নাহি জানে আর ॥
সহস্র-বদনে করে কৃষ্ণগুণ গান ।
নিরবধি গুণ গা’ন, অন্ত নাহি পা’ন ॥
সেই অনন্তশেষ হচ্ছেন ভগবানের ভক্ত-অবতার । ভগবান শ্রীকৃষ্ণের সেবা ছাড়া তিনি আর কিছু জানেন না । সমস্র বদনে তিনি শ্রীকৃষ্ণের মহিমা কীর্তন করেন, কিন্তু এভাবেই নিরন্তর কীর্তন করেও তিনি ভগবানের মহিমার অন্ত পান না ।
কর্ণেন্দ্রিয়ের প্রকৃত উপযোগ
চৈঃ চঃ মধ্য ২.৩১
কৃষ্ণের মধুর বাণী, অমৃতের তরঙ্গিণী,
তার প্রবেশ নাহি যে শ্রবণে ৷
কাণাকড়ি-ছিদ্র সম, জানিহ সে শ্রবণ,
তার জন্ম হৈল অকারণে ৷
শ্রীকৃষ্ণের মধুর বাণী অমৃতের তরঙ্গের মতো । সেই অমৃত যদি কর্ণকুহরে প্রবেশ না করে, তা হলে সেই কর্ণ কানাকড়ির ছিদ্রের মতো। অকারণে সেই কর্ণের সৃষ্টি হয়েছে ।
কৃষ্ণচরণ লাভের পন্থা
চৈঃ চঃ অন্ত্য ৪.৬৫
কুবুদ্ধি ছাড়িয়া কর শ্রবণ-কীর্তন ।
অচিরাৎ পাবে তবে কৃষ্ণের চরণ ॥
শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু সনাতন গোস্বামীকে বললেন, “তোমার সমস্ত দুর্বাসনা পরিত্যাগ কর, কেননা সেগুলি শ্রীকৃষ্ণের শ্রীপাদপদ্মে আশ্রয় লাভ করার প্রতিকূল । কৃষ্ণনাম শ্রবণ কীর্তনে মগ্ন হও । তাহলে অচিরেই তুমি কৃষ্ণের শ্রীপাদপদ্মের আশ্রয় লাভ করবে।” [সনাতন গোস্বামীর পরিকল্পনা ছিল জগন্নাথের রথযাত্রায়
দেহত্যাগ করবেন । তাঁর এই পরিকল্পনা পরিত্যাগ করতে মহাপ্রভুর আজ্ঞা]
কৃষ্ণকথায় রুচি
চৈঃ চঃ অন্ত্য ৫.৯
কৃষ্ণকথায় রুচি তোমার — বড় ভাগ্যবান্ ।
যার কৃষ্ণকথায় রুচি, সেই ভাগ্যবান্ ॥
“আমি দেখতে পাচ্ছি যে কৃষ্ণকথায় তোমার রুচি হয়েছে তাই তুমি মহা ভাগ্যবান্ । কৃষ্ণকথায় যার রুচির উদয় হয়েছে সেই ভাগ্যবান্।” [প্রদ্যুম্ন মিশ্রের প্রতি মহাপ্রভু]
চৈতন্য লীলার মাহাত্ম্য
চৈতন্য লীলার ফলশ্রুতি
চৈঃ চঃ আদি ১.১০৭-১০৯
শুনিলে খণ্ডিবে চিত্তের অজ্ঞানাদি দোষ ৷
কৃষ্ণে গাঢ় প্রেম হবে, পাইবে সন্তোষ ॥
শ্রীচৈতন্য-নিত্যানন্দ-অদ্বৈত-মহত্ত্ব ।
তাঁর ভক্ত-ভক্তি-নাম-প্রেম-রসতত্ত্ব ৷৷
ভিন্ন ভিন্ন লিখিয়াছি করিয়া বিচার।
শুনিলে জানিবে সব বস্তুতত্ত্বসার ৷৷
কেবল মাত্র বিনীতভাবে তা শ্রবণ করলেই অজ্ঞানতা জনিত হৃদয়ের সমস্ত দোষ খণ্ডন হয় এবং শ্রীকৃষ্ণের প্রতি গভীর অনুরাগ লাভ হয় । এটিই হচ্ছে শান্তি লাভের প্রকৃষ্ট পন্থা । যদি ধৈর্য সহকারে শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর মহিমা, শ্রীনিত্যানন্দ প্রভুর মহিমা, শ্রীঅদ্বৈত আচার্য প্রভুর মহিমা এবং তাঁদের ভক্ত, ভক্তি, নাম, যশ ও তাঁদের প্রেমময়ী সম্পর্কের মাহাত্ম্য শ্রবণ করা হয়, তা হলে সমস্ত তত্ত্ববস্তুর সার বিষয় হৃদয়ঙ্গম করা যায় । তাই, আমি যুক্তি ও বিচারপূর্বক এই সমস্ত বিষয় (শ্রীচৈতন্য- চরিতামৃতে) বর্ণনা করেছি ।
নিয়মিত শ্রবণ, কীর্তন, চিন্তন
চৈঃ চঃ অন্ত্য ১২.১
শ্রুয়তাং শ্রুয়তাং নিত্যং গীয়তাং গীয়তাং মুদা ।
চিন্ত্যতাং চিন্ত্যতাং ভক্তাশ্চৈতন্য চরিতামৃতম্ ৷৷
হে ভক্তগণ, এই শ্রীচৈতন্য-চরিতামৃত নিত্য শ্রবণ করুন, গান করুন এবং আনন্দে চিন্তা করুন ।
অমৃত-সিন্ধু
চৈঃ চঃ আদি ১২.৯৪
গৌরলীলামৃতসিন্ধু—অপার অগাধ ৷
কে করিতে পারে তাহা অবগাহ—সাধ ৷৷
শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর লীলা-সমুদ্র অপরিমেয় ও অগাধ । এমন কেউ আছে কি, যার সেই বিশাল সমুদ্রের পরিমাপ করার সাহস আছে?
চৈঃ চঃ অন্ত্য ৫.৮৮-৮৯
শ্রীচৈতন্যলীলা এই -অমৃতের সিন্ধু ।
ত্রিজগৎ ভাসাইতে পারে যার এক বিন্দু ॥
চৈতন্যচরিতামৃত নিত্য কর পান ।
যাহা হৈতে ‘প্রেমানন্দ’, ‘ভক্তিতত্ত্ব-জ্ঞান’ ॥
শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর এই লীলা অমৃতের সমুদ্রের মতো, যার এক বিন্দুতে ত্রিজগৎ ভাসাতে পারে । হে ভক্তগণ, নিরন্তর শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর লীলার অমৃত পান কর। তার ফলে প্রেমানন্দ আস্বাদন করতে পারবে এবং ভক্তিতত্ত্বের জ্ঞান লাভ করতে পারবে ।
চৈঃ চঃ অন্ত্য ১১.50-109
চৈতন্যচরিত্র এই অমৃতের সিন্ধু ।
কর্ণ-মন তৃপ্ত করে যার এক বিন্দু ৷
ভবসিন্ধু তরিবারে আছে যার চিত্ত।
শ্রদ্ধা করি' শুন সেই চৈতন্যচরিত্র ৷
শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর চরিত্র ঠিক একটি অমৃতের সমুদ্রের মতো, যার এক বিন্দু কর্ণ এবং মনকে সম্পূর্ণরূপে তৃপ্ত করে । যিনি ভবসমুদ্র পার হতে আগ্রহী, তিনি যেন শ্রদ্ধা সহকারে শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর চরিতামৃত শ্রবণ করেন ।
চৈঃ চঃ আদি ১৬.১
চৈতন্য-গোসাঞির লীলা—অমৃতের ধার ।
সর্বেন্দ্রিয় তৃপ্ত হয় শ্রবণে যাহার ৷৷
শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর লীলা অমৃতের ধারার মতো এবং তা শ্রবণ করার ফলে সমস্ত ইন্দ্ৰিয় তৃপ্ত হয় ।
স্বরূপের ভাণ্ডারে রত্নসার
চৈঃ চঃ মধ্য ২.৮৪
চৈতন্যলীলা-রত্ন-সার, স্বরূপের ভাণ্ডার,
তেঁহো থুইলা রঘুনাথের কন্ঠে ।
তাঁহা কিছু যে শুনিলু, তাহা ইহা বিস্তারিহুঁ,
ভক্তগণে দিলু এই ভেটে ৷৷
শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর লীলা সমস্ত রত্নের সার । স্বরূপ দামোদর গোস্বামীর ভাণ্ডারে সেই রত্নরাজি ছিল । তিনি তা শ্রীল রঘুনাথ দাস গোস্বামীর কণ্ঠে রেখেছিলেন। তাঁর কাছ থেকে অল্প যেটুকু আমি শ্রবণ করেছি, তা আমি এই গ্রন্থে বর্ণনা করে সমস্ত ভক্তদের কাছে উপহার-স্বরূপ নিবেদন করলাম ।
অদ্ভুত চৈতন্যচরিত
চৈঃ চঃ মধ্য ২.৮৭
যেবা নাহি বুঝে কেহ, শুনিতে শুনিতে সেহ,
জানিবে রসের রীতি,
কি অদ্ভুত চৈতন্যচরিত।
কৃষ্ণে উপজিবে প্রীতি,
শুনিলেই বড় হয় হিত ৷৷
প্রথমে কেউ যদি তা বুঝতে নাও পারে, কিন্তু বারবার শোনার ফলে তার হৃদয়েও কৃষ্ণপ্রেমের উদয় হবে । এমনই অদ্ভুত শ্ৰীচৈতন্য মহাপ্রভুর লীলার প্রভাব যে, ধীরে ধীরে ব্রজগোপিকাদের সঙ্গে ও ব্রজবাসীদের সঙ্গে শ্রীকৃষ্ণের অপ্রাকৃত প্ৰেম তখন হৃদয়ঙ্গম হবে। তাই সকলকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে বারবার এই গ্রন্থ শ্রবণ করার জন্য, যার প্রভাবে ধীরে ধীরে পরম কল্যাণ সাধিত হবে।
মিশ্রিযুক্ত ঘনদুগ্ধ কর্ণদ্বারা পান করুন
চৈঃ চঃ মধ্য ৮.৩08-306
সহজে চৈতন্যচরিত্র—ঘনদুগ্ধপূর।
রামানন্দ-চরিত্র তাহে খণ্ড প্রচুর ৷
রাধাকৃষ্ণলীলা—তাতে কর্পূর-মিলন।
ভাগ্যবান্ যেই, সেই করে আস্বাদন ৷৷
যে ইহা একবার পিয়ে কর্ণদ্বারে।
তার কর্ণ লোভে ইহা ছাড়িতে না পারে ॥
শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর চরিত্র ঘন দুধের মতো, আর রামানন্দ রায়ের চরিত্র মিশ্রির মতো তাতে মিষ্টতা প্রদান করেছে । তাতে আবার রাধাকৃষ্ণের লীলারূপ কর্পূরের মিশ্রণ হয়েছে । যারা ভাগ্যবান, তারাই সেই অমৃত আস্বাদন করতে পারেন । এই অপূর্ব বস্তুটি যিনি একবার তাঁর কর্ণদ্বারা পান করেছেন, তাঁর কর্ণ বারবার সেই অমৃত আস্বাদনের লোভে উন্মত্ত হয়ে তা আর ছাড়তে পারে না ।
লোভী ও নির্লজ্জ প্রয়াস
চৈঃ চঃ মধ্য ৯.৩৫৯
অনন্ত চৈতন্যলীলা কহিতে না জানি ।
লোভে লজ্জা খাঞা তার করি টানাটানি ৷৷
শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর লীলা অনন্ত । কেউই তা যথাযথভাবে বর্ণনা করতে পারে না, তবুও লোভের বশবর্তী হয়ে, লজ্জার মাথা খেয়ে, তা নিয়ে টানাটানি করি ।
কেবল তীরে দাঁড়িয়ে স্পর্শ
চৈঃ চঃ মধ্য ৯.৩৬৩
চৈতন্যচন্দ্রের লীলা—অগাধ, গম্ভীর ।
প্রবেশ করিতে নারি,—স্পর্শি রহি' তীর ॥
শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর লীলা অন্তহীন এবং গভীর । তাতে প্রবেশ করার ক্ষমতা আমার নেই, তাই তীরে দাঁড়িয়ে আমি তা কেবল স্পর্শ করি ।
অলৌকিক চৈতন্যলীলা শ্রবণে
জন্ম এবং দেহ ধন্য
চৈঃ চঃ মধ্য ১৬.২01
অলৌকিক লীলা করে শ্রীকৃষ্ণচৈতন্য ।
যেই ইহা শুনে তাঁর জন্ম, দেহ ধন্য ৷
শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু অলৌকিক লীলাবিলাস করেন, যিনি তা শোনেন তার জন্ম এবং দেহ ধন্য ।
অনন্তদেব সহস্র বদনেও এক একটি লীলার অন্ত খুঁজে পান না
চৈঃ চঃ মধ্য ১৬.২88-289
এই মত গৌরলীলা – অনন্ত, অপার ।
সংক্ষেপে কহিয়ে, কহা না যায় বিস্তার ॥
সহস্র-বদনে কহে আপনে ‘অনন্ত'।
তবু এক লীলার তেঁহো নাহি পায় অন্ত ॥
এইভাবে, শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু লীলা অনন্ত এবং অপার । সংক্ষেপে আমি তা বর্ণনা করছি। বিস্তারিতভাবে তা বর্ণনা করা সম্ভব নয় । অনন্তদেব সহস্র বদনে নিরন্তর ভগবানের লীলা বর্ণনা করেছেন, কিন্তু তবুও । তিনি এক একটি লীলার অন্ত খুঁজে পান না ।
শক্তি অনুসারে চৈতন্যলীলা প্লাবনে সাঁতার
চৈঃ চঃ মধ্য ১৭.233
জগৎ ভাসিল চৈতন্যলীলার পাথারে।
যাঁর যত শক্তি তত পাথারে সাঁতারে ॥
শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর লীলারূপ বন্যায় জগৎ ভেসে গেল, যার যত শক্তি সেই অনুসারে তিনি সেই প্লাবনে সাঁতার কাটতে পারেন ।
অক্ষয় সরোবরে মনো-হংসের বিচরণ
চৈঃ চঃ মধ্য ২৫.595
কৃষ্ণলীলা অমৃত-সার, তার শত শত ধার,
দশদিকে বহে যাহা হৈতে ৷
সে চৈতন্যলীলা হয়, সরোবর অক্ষয়,
মনো-হংস চরাহ' তাহাতে ৷
শ্রীকৃষ্ণের লীলা সমস্ত অমৃতের সারাতিসার। তা শত শত ধারায় দশদিকে প্রবাহিত হয় । শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর লীলা এক অক্ষয় সরোবর স্বরূপ, তোমার মনরূপ হংসকে সেই সরোবরে বিচরণ করাও ।
মাধুৰ্য-প্রাচুর্য মিশ্রণ
চৈঃ চঃ মধ্য ২৫.২99
চৈতন্যলীলা—অমৃতপুর,
কৃষ্ণলীলা—সুকপূর,
দুহে মিলি' হয় সুমাধুর্য।
সাধু-গুরু-প্রসাদে,
তাহা যেই আস্বাদে,
সেই জানে মাধুর্য-প্রাচুর্য ৷৷
শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর লীলা অমৃতময় এবং শ্রীকৃষ্ণের লীলা কর্পূরের মতো। যখন এই দুয়ের মিলন হয়, তখন তার স্বাদ হয় অত্যন্ত মধুর । সাধু-গুরু-প্রসাদে তা যিনি আস্বাদন করেন, তিনিই সেই মাধুর্যের প্রাচুর্য হৃদয়ঙ্গম করতে পারেন ।
ভক্তের প্রকৃত পুষ্টি
চৈঃ চঃ মধ্য ২৫.২৭৮
যে লীলা-অমৃত বিনে, খায় যদি অন্নপানে,
তবে ভক্তের দুর্বল জীবন ।
যার একবিন্দু-পানে, উৎফুল্লিত তনুমনে,
হাসে, গায়, করয়ে নর্তন ৷৷
অন্ন খেয়ে মানুষ পুষ্ট হয়, কিন্তু ভক্ত যদি সাধারণ মানুষের মতো কেবল অন্ন খায় কিন্তু শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু এবং শ্রীকৃষ্ণের অপ্রাকৃত লীলামৃত আস্বাদন না করে, তাহলে সে দুর্বল হয়ে চিন্ময় স্তর থেকে অধঃপতিত হয় । কিন্তু কেউ যদি কৃষ্ণলীলামৃতের একবিন্দুও পান করেন, তাহলে তাঁর দেহ ও মন উৎফুল্লিত হয়, এবং তিনি প্রেমানন্দে মগ্ন হয়ে হাসেন, গান করেন এবং নৃত্য করেন।
এই অমৃত পানের শর্তদ্বয়
চৈঃ চঃ মধ্য ২৫.579
এ অমৃত কর পান, যার সম নাহি আন,
চিত্তে করি' সুদৃঢ় বিশ্বাস ৷
না পড়' কুতর্ক-গর্তে, অমেধ্য কর্কশ আবর্তে,
যাতে পড়িলে হয় সৰ্বনাশ ৷৷
হৃদয়ে সুদৃঢ় বিশ্বাস সহকারে এই অতুলনীয় অমৃত পান কর । কুতর্করূপ গর্তে অথবা অপবিত্র কর্কশ আবর্তে পতিত হয়ো না -তাতে পড়লে তোমার সর্বনাশ হবে ।
চৈতন্য লীলার স্বভাব
চৈঃ চঃ অন্ত্য 3.264
চৈতন্য-গোসাঞির লীলার এই ত' স্বভাব ৷
ত্রিভুবন নাচে, গায়, পাঞা প্ৰেমভাব ৷৷ ২৬৭ ৷৷
শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর লীলার প্রভাবে ত্রিভুবন প্ৰেমভাব প্রাপ্ত হয়ে মহা আনন্দে নৃত্য করে, গান গায় । এইটিই তাঁর লীলার স্বভাব।
ইক্ষুদণ্ডসম
চৈঃ চঃ অন্ত্য ৪.২৩৮
চৈতন্যচরিত্র এই—ইক্ষুদণ্ড-সম ।
চর্বণ করিতে হয় রস-আস্বাদন ৷৷
শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর এই চরিত্র কথা আখের মতো; যা শ্রবণ করলে অপ্রাকৃত রস আস্বাদন করা যায় ।
ভক্তিতত্ত্ব, ভক্ততত্ত্ব এবং রসতত্ত্ব হৃদয়ঙ্গম
চৈঃ চঃ অন্ত্য ৫.১৬২-১৬৩
শ্ৰীকৃষ্ণচৈতন্য-লীলা—অমৃতের সার ।
একলীলা-প্রবাহে বহে শত-শত ধার ॥
শ্রদ্ধা করি' এই লীলা যেই পড়ে, শুনে।
গৌরলীলা, ভক্তি-ভক্ত-রস তত্ত্ব জানে ৷
শ্রীকৃষ্ণচৈতন্য মহাপ্রভুর লীলা অমৃতের সার, তাঁর এক একটি লীলা-প্রবাহের শত শত ধারা। যে শ্রদ্ধা সহকারে এই লীলা শ্রবণ করে বা পাঠ করে, সেই শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর লীলার ভক্তিতত্ত্ব, ভক্ততত্ত্ব এবং রসতত্ত্ব হৃদয়ঙ্গম করতে পারে ।
নিত্য-নতুন
চৈঃ চঃ অন্ত্য ১৯.১১১
চৈতন্য চরিতামৃত – নিত্য-নূতন ৷
শুনিতে শুনিতে জুড়ায় হৃদয় শ্রবণ ৷৷
শ্রীচৈতন্য চরিতামৃত নিত্য নতুন । সবসময় তা শুনলে হৃদয় এবং শ্রবণ জুড়িয়ে যায় ।
চৈতন্যলীলা শ্রবণ ও হৃদয়ঙ্গমের পন্থা
অভক্তের দর্শন অসম্ভব
চৈঃ চঃ আদি ৩.৮৫-৮৬
প্রত্যক্ষে দেখহ নানা প্রকট প্রভাব ৷
অলৌকিক, কর্ম, অলৌকিক অনুভাব ৷৷
দেখিয়া না দেখে যত অভক্তের গণ।
উলুকে না দেখে যেন সূর্যের কিরণ ৷
শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর অলৌকিক কার্যকলাপ এবং অলৌকিক ভক্তিভাবের প্রকাশ প্রত্যক্ষভাবে দেখতে পাওয়া যায় । কিন্তু অভক্তেরা তা দেখেও দেখতে পায় না, ঠিক যেমন পেঁচা সূর্যের
কিরণ দেখতে পায় না ৷
হৃদয়ে শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু ও শ্রীনিত্যানন্দ প্রভুকে ধারণ
চৈঃ চঃ আদি ৪.২৩৩
হৃদয়ে ধরয়ে যে চৈতন্য-নিত্যানন্দ।
এসব সিদ্ধান্তে সেই পাইবে আনন্দ ৷
যে মানুষ তাঁর হৃদয়ে শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু ও শ্রীনিত্যানন্দ প্রভুকে ধারণ করেছেন, তিনি এই সকল অপ্রাকৃত সিদ্ধান্ত শ্রবণ করে আনন্দে মগ্ন হবেন।
শ্রদ্ধা সহকারে শ্রবণ
চৈঃ চঃ অন্ত ১১.১09
ভবসিন্ধু তরিবারে আছে যার চিত্ত ।
শ্রদ্ধা করি' শুন সেই চৈতন্যচরিত্র ৷৷
যিনি ভবসমুদ্র পার হতে আগ্রহী, তিনি যেন শ্রদ্ধা সহকারে শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর চরিতামৃত শ্রবণ করেন ।
চৈঃ চঃ অন্ত্য ১৯.১১০
শ্রদ্ধা করি' শুন ইহা, শুনিতে মহাসুখ ।
খণ্ডিবে অ্যাধ্যাত্মিকাদি কুতর্কাদি-দুঃখ ৷৷
শ্রদ্ধা সহকারে এই সমস্ত বিষয় শোন, কেননা, তা শুনতে মহাসুখ । তা শোনার ফলে আধ্যাত্মিক, আধিভৌতিক ও আধিদৈবিক এবং কুতর্ক আদি সমস্ত দুঃখ দূর হবে ।
গৌরভক্তের সঙ্গফলেই গৌর-লীলা-তত্ত্ব
বোধগম্য হয়
চৈঃ চঃ মধ্য ২.৮৩
কহিবার কথা নহে, কহিলে কেহ না বুঝয়ে,
ঐছে চিত্র চৈতন্যের রঙ্গ ।
সেই সে বুঝিতে পারে, চৈতন্যের কৃপা যাঁরে,
হয় তাঁর দাসানুদাস-সঙ্গ ৷৷
এটি সর্বসমক্ষে বলার মতো কথা নয়, কেন না তা বলা হলেও কেউ তা বুঝতে পারবে না । এমনই অদ্ভুত শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর লীলা । যিনি শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর কৃপায় তাঁর দাসানুদাসের সঙ্গ লাভ করেছেন, তিনি এই তত্ত্ব বুঝতে পারেন ।
বারবার শ্রবণ
চৈঃ চঃ মধ্য ২.৮৭
যেবা নাহি বুঝে কেহ, কি শুনিতে শুনিতে সেহ,
অদ্ভুত চৈতন্যচরিত।
কৃষ্ণে উপজিবে প্রীতি, জানিবে রসের রীতি,
শুনিলেই বড় হয় হিত ৷
প্রথমে কেউ যদি তা বুঝতে নাও পারে, কিন্তু বারবার শোনার ফলে তার হৃদয়েও কৃষ্ণপ্রেমের উদয় হবে । এমনই অদ্ভুত শ্ৰীচৈতন্য । মহাপ্রভুর লীলার প্রভাব যে, ধীরে ধীরে ব্রজগোপিকাদের সঙ্গে ও ব্রজবাসীদের সঙ্গে শ্রীকৃষ্ণের অপ্রাকৃত প্ৰেম তখন হৃদয়ঙ্গম হবে। তাই সকলকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে বারবার এই গ্রন্থ শ্রবণ করার জন্য, যার প্রভাবে ধীরে ধীরে পরম কল্যাণ সাধিত হবে।
অলৌকিক লীলায় অবিশ্বাসী ব্যক্তির পরিণতি
চৈঃ চঃ মধ্য ৭.১১
অলৌকিক-লীলায় যার না হয় বিশ্বাস ।
ইহলোক, পরলোক তার হয় নাশ ॥
মহাপ্রভুর অলৌকিক লীলায় যার বিশ্বাস হয় না, তার ইহলোক এবং পরলোক উভয়ই বিনষ্ট হয় ।
বিশ্বাসে পাইয়ে, তর্কে হয় বহু-দূর
চৈঃ চঃ মধ্য ৮.৩০৮ ৩০৯
চৈতন্যের গূঢ়তত্ত্ব জানি ইহা হৈতে ৷
বিশ্বাস করি' শুন, তর্ক না করিহ চিত্তে ॥
অলৌকিক লীলা এই পরম নিগূঢ় ।
বিশ্বাসে পাইয়ে, তর্কে হয় বহু-দূর।।
গ্রন্থকার সমস্ত পাঠকদের অনুরোধ করেছেন, তর্ক না করে বিশ্বাস সহকারে এই আলোচনা পাঠ করতে, তার ফলে শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর গূঢ়তত্ত্ব জানতে পারা যাবে । শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর এই অলৌকিক লীলা অত্যন্ত গোপনীয় । বিশ্বাসের দ্বারা তার মর্ম উপলব্ধি করা যায়, তা না হলে তর্ক করে তা কখনও বোঝা যাবে না।
তর্কে হবে বিপরীত
চৈঃ চঃ অন্ত্য ২.১৭১
বিশ্বাস করিয়া শুন চৈতন্যচরিত।
তর্ক না করিহ, তর্কে হবে বিপরীত ৷৷
দয়া করে বিশ্বাস সহকারে শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর লীলা শ্রবণ করুন । তর্ক করবেন না, তর্ক করলে তার ফল বিপরীত হবে ।
তর্কের অগোচর তাঁর রীতি
চৈঃ চঃ অন্ত্য 3.258
তর্ক না করিহ, তর্কাগোচর তাঁর রীতি ।
বিশ্বাস করিয়া শুন করিয়া প্রতীতি ৷৷
সেই ঘটনা শ্রবণ করে শুষ্ক যুক্তির ভিত্তিতে তর্ক করো না, কেননা সেই সমস্ত ঘটনা তর্কের অগোচর । তাই বিশ্বাস সহকারে তা শ্রবণ কর।
‘মুর্খরাজ’ তার্কিক
চৈঃ চঃ মধ্য ১৮.559
যেই তর্ক করে ইহাঁ, সেই ‘মুর্খরাজ’।
আপনার মুণ্ডে সে আপনি পাড়ে বাজ ৷৷
এই বিষয়ে যেই তর্ক করে, সেই ‘মুর্খরাজ’ । সে স্বেচ্ছায় তার মাথায় বজ্রপাত করে।
‘ধীর’ ভক্তরাই কেবল বুঝতে পারে
চৈঃ চঃ অন্ত্য ২.১৭0
মধুর চৈতন্যলীলা সমুদ্র গম্ভীর।
লোকে নাহি বুঝে, বুঝে যেই ‘ভক্ত’ ‘ধীর’ ॥
শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর লীলা অমৃতের মতো মধুর, এবং সমুদ্রের মতো গম্ভীর । সাধারণ মানুষ সেই লীলার মহিমা বুঝতে পারে না; ‘ধীর’ ভক্তরাই কেবল তা বুঝতে পারে ।
ভগবানের লীলা শ্রবণে ভক্তের মনোভাব
চৈঃ চঃ মধ্য ৯.১২৫
আমি জীব,—ক্ষুদ্রবুদ্ধি, সহজে অস্থির।
ঈশ্বরের লীলা—কোটিসমুদ্র-গম্ভীর ৷
ব্যেঙ্কটভট্ট তখন স্বীকার করলেন, “আমি একটি ক্ষুদ্রবুদ্ধিসম্পন্ন সাধারণ জীব, এবং স্বাভাবিকভাবে অস্থির । আর ভগবানের লীলা কোটিসমুদ্রের মতো গম্ভীর ।” [মহাপ্রভুর প্রতি ব্যেঙ্কটভট্ট]
অপ্রাকৃত বস্তু প্রাকৃতের অগোচর
চৈঃ চঃ মধ্য ৯.১৯৪
অপ্রাকৃত বস্তু নহে প্রাকৃত-গোচর ।
বেদ-পুরাণেতে এই কহে নিরন্তর ৷৷
“অপ্রাকৃত বস্তু প্রাকৃত ইন্দ্রিয়ের গোচরীভূত নয় । সমস্ত বেদ এবং পুরাণে নিরন্তর এই সিদ্ধান্তই প্রতিপন্ন হয়েছে ।” [মাদুরাইতে রামভক্ত ব্রাহ্মণের প্রতি মহাপ্রভু]
মাৎসর্য পরিত্যাগ
চৈঃ চঃ মধ্য ৯.৩৬১
চৈতন্যচরিত শুন শ্রদ্ধা-ভক্তি করি' ।
মাৎসর্য ছাড়িয়া মুখে বল ‘হরি’ ‘হরি’ ৷৷
দয়া করে শ্রদ্ধা এবং ভক্তি সহকারে শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর অপ্রাকৃত-লীলা শ্রবণ করুন এবং মাৎসর্য পরিত্যাগ করে মুখে ‘হরি’ ‘হরি’ বলুন ।
চৈতন্যচরিত বিচার
চৈঃ চঃ মধ্য ৯.৩৬৪
চৈতন্যচরিত শ্রদ্ধায় শুনে যেই জন ।
যতেক বিচারে, তত পায় প্ৰেমধন ৷৷
শ্রদ্ধা-সহকারে যিনি শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর লীলা যতই শ্রবণ করেন এবং বিচার করেন, ততই তিনি ভগবৎ-প্রেমরূপ মহাসম্পদ লাভ করেন।
কেবল মহাপ্রভুর দ্বারা শক্তিপ্রাপ্ত ব্যক্তিই তা বুঝতে এবং বর্ণনা করতে পারেন
চৈঃ চঃ অন্ত্য ১৪.৬
বুঝিতে না পারি যাহা, বর্ণিতে কে পারে ?
সেই বুঝে, বর্ণে, চৈতন্য শক্তি দেন যাঁরে ৷
যা বোঝা যায় না তা বর্ণনা কে করতে পারে ? শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু যাঁকে শক্তি দেন তিনিই বুঝতে পারেন এবং বর্ণনা করতে পারেন ।
ভাগ্যহীন ব্যক্তি শুনলেও অবিশ্বাস করে
চৈঃ চঃ মধ্য ১৮.২55-556
অলৌকিক-লীলা প্রভুর অলৌকিক-রীতি ।
শুনিলেও ভাগ্যহীনের না হয় প্রতীতি ॥
আদ্যোপান্ত চৈতন্যলীলা 'অলৌকিক' জান'।
শ্রদ্ধা করি' শুন ইহা, ‘সত্য’ করি’ মান’ ॥
শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর লীলা এবং রীতি অলৌকিক । যারা ভাগ্যহীন, তারা তা শুনলেও বিশ্বাস করতে পারে না। শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর লীলার আদি থেকে অন্ত পর্যন্ত সবকিছুই অলৌকিক বলে জেনো। শ্রদ্ধা সহকারে তা শ্রবণ কর, এবং তা সত্য বলে মনে কর।
আম্র-পল্লব কোকিলের কাছে প্রিয়, উটের কাছে নয়
চৈঃ চঃ আদি ৪.২৩৪-২৩৫
এ সব সিদ্ধান্ত হয় আম্রের পল্লব।
ভক্তগণ-কোকিলের সর্বদা বল্লভ ।
অভক্ত-উষ্ট্রের ইথে না হয় প্রবেশ
তবে চিত্তে হয় মোর আনন্দ-বিশেষ ।
এই সমস্ত সিদ্ধান্তগুলি হচ্ছে নব বিকশিত আম্র-পল্লবের মতো; সেগুলি কোকিলের মতো ভক্তদের কাছে সর্বদা অত্যন্ত প্ৰিয় । উষ্ট্রের মতো অভক্তেরা এই সমস্ত আলোচনায় প্রবেশ করতে পারে না । তাই আমার হৃদয়ে বিশেষ আনন্দ হচ্ছে ।
কাঠের পুতলী
চৈঃ চঃ অন্ত্য ১২.৮৫
কাষ্ঠের পুতলী যেন কুহকে নাচায় ৷
ঈশ্বর-চরিত্র কিছু বুঝন না যায় ৷৷
যাদুকর যেভাবে কাঠের পুতুল নাচায়, তেমনইভাবে ভগবান সকলকে নাচান । পরমেশ্বর ভগবানের চরিত্র বোঝা কার পক্ষে সম্ভব ?
ঈশ্বর-তত্ত্ব কিভাবে জানা যায় ?
চৈঃ চঃ মধ্য ৬.৮৩
ঈশ্বরের কৃপা-লেশ হয় ত' যাহারে ৷
সেই ত' ঈশ্বর-তত্ত্ব জানিবারে পারে ৷
গোপীনাথ আচার্য আরও বললেন—“ভগবদ্ভক্তি অনুশীলনের ফলে যিনি ভগবানের কৃপা লাভ করেছেন, তিনিই কেবল পরমেশ্বর ভগবানের তত্ত্ব জানতে পারেন।”
ফলশ্রুতি
হরিদাস ঠাকুরের তিরোভাব শ্রবণের ফল
চৈঃ চঃ অন্ত্য ১১.১১
এই ত কহিলঁ হরিদাসের বিজয় ।
যাহার শ্রবণে কৃষ্ণে দৃঢ় ভক্তি হয় ।
এইভাবে আমি হরিদাস ঠাকুরের জয়যুক্ত অপ্রকটলীলা বর্ণনা করলাম, যা শ্রবণ করলে শ্রীকৃষ্ণে দৃঢ়ভক্তি লাভ হয় ।
মহাপ্রভুর জন্মলীলা শ্রবণের ফল
চৈঃ চঃ আদি ১৩.১55
ঐছে প্রভু শচী-ঘরে, কৃপায় কৈল অবতারে,
যেই ইহা করয়ে শ্রবণ ৷
গৌরপ্রভু দয়াময়, তাঁরে হয়েন সদয়,
সেই পায় তাঁহার চরণ ৷৷
এভাবেই শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু তাঁর অহৈতুকী কৃপার প্রভাবে শচীদেবীর গৃহে আবির্ভূত হয়েছিলেন। যিনি তাঁর এই জন্মলীলা শ্রবণ করেন, তাঁর প্রতি দয়াময় গৌরপ্রভু অত্যন্ত সদয় হন এবং সেই ব্যক্তি তাঁর শ্রীচরণে আশ্রয় লাভ করেন।
ত্রিতাপ ও কুতর্কাদি দুঃখ দূর
চৈঃ চঃ অন্ত্য ১৯.১১
শ্রদ্ধা করি' শুন ইহা, শুনিতে মহাসুখ ।
খণ্ডিবে অ্যাধ্যাত্মিকাদি কুতর্কাদি-দুঃখ ৷৷
শ্রদ্ধা সহকারে এই সমস্ত বিষয় শোন, কেননা, তা শুনতে মহাসুখ । তা শোনার ফলে আধ্যাত্মিক, আধিভৌতিক ও আধিদৈবিক এবং কুতর্ক আদি সমস্ত দুঃখ দূর হবে ।
‘প্রেমবিবর্ত’ শ্রবণের ফল
চৈঃ চঃ অন্ত্য ১২.১৫৪
জগদানন্দের ‘প্রেমবিবর্ত' শুনে যেই জন ।
প্রেমের ‘স্বরূপ’ জানে, পায় প্রেমধন ৷৷
শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর সঙ্গে জগদানন্দ পণ্ডিতের প্রেমের বিবর্ত, অথবা জগদানন্দ পণ্ডিত রচিত ‘প্রেমবিবর্ত' যিনি শ্রবণ করেন, তিনিই প্রেমের স্বরূপ জানতে পারেন এবং কৃষ্ণপ্রেমরূপ মহা সম্পদ লাভ করেন।
মহাপ্রসাদ মাহাত্ম্য
মহাপ্রসাদ উপেক্ষা করা অনুচিত
চৈঃ চঃ অন্ত্য ১১.১৯
সংখ্যা-কীর্তন পূরে নাহি, কেমতে খাইব?
মহাপ্রসাদ আনিয়াছ, কেমতে উপেক্ষিব?
আমার সংখ্যাপূর্বক নাম সমাপ্ত হয়নি, তাই আমি খাব কি করে ? অথচ তুমি মহাপ্রসাদ নিয়ে এসেছ, তাও বা আমি উপেক্ষা করব কি করে ?
[মহাপ্রভু তাঁর সেবক গোবিন্দকে দিয়ে হরিদাস ঠাকুরের জন্য জগন্নাথের মহাপ্রসাদ প্রেরণ করলে হরিদাস ঠাকুরের উক্তি
সার্বভৌম ভট্টাচার্যের মহাপ্রসাদে বিশ্বাস
চৈঃ চঃ মধ্য ৬.২৩১
আজি মোর পূর্ণ হৈল সর্ব অভিলাষ ৷
সার্বভৌমের হৈল মহাপ্রসাদে বিশ্বাস ৷
শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু বলতে লাগলেন—“আজ আমার সমস্ত অভিলাষ পূর্ণ হল, কেননা আজ আমি দেখলাম যে, জগন্নাথদেবের মহাপ্রসাদের প্রতি সার্বভৌম ভট্টাচার্যের গভীর বিশ্বাস জন্মেছে।” একদিন প্রাতকালে মহাপ্রভু জগন্নাথ দর্শন করে সার্বভৌম ভট্টাচার্যের জন্য মহাপ্রসাদ নিয়ে এলে সার্বভৌম তৎক্ষণাৎ তাঁর প্রাতঃকৃত্য সম্পাদন ব্যতিরেকেই সেই মহাপ্রসাদ বন্দনা করলেন এবং তা গ্রহণ করলেন । তাঁর এই আচরণে অতীব প্রসন্ন হয়ে মহাপ্রভু নিম্নোক্ত শ্লোকগুলি বললেন.....
চৈঃ চঃ মধ্য ৬.২৩৩
আজি সে খণ্ডিল তোমার দেহাদি-বন্ধন ৷ আজি তুমি ছিন্ন কৈলে মায়ার বন্ধন ৷৷
আজ কৃষ্ণ তোমার দেহাদি-বন্ধন থেকে মুক্ত করলেন, এবং আজ তুমি মায়ার বন্ধন ছিন্ন করলে ।
চৈঃ চঃ মধ্য ৬.238
আজি কৃষ্ণপ্রাপ্তি-যোগ্য হৈল তোমার মন ৷
বেদ-ধর্ম লঙ্ঘি' কৈলে প্ৰসাদ ভক্ষণ ।
আজ তোমার মন শ্রীকৃষ্ণের চরণারবিন্দের আশ্রয় গ্রহণ করার যোগ্যতা অর্জন করল, কেননা বৈদিক বিধি-নিষেধ লঙ্ঘন করে তুমি প্রসাদ ভক্ষণ করেছ।
রাগমার্গ এবং বিধিমার্গ
চৈঃ চঃ মধ্য ১১.১১১
রাজা কহে,—উপবাস, ক্ষৌর – তীর্থের বিধান ।
তাহা না করিয়া কেনে খাইব অন্ন-পান ॥
রাজা তখন সার্বভৌম ভট্টাচার্যকে জিজ্ঞাসা করলেন, “তীর্থে এসে উপবাস করা, ক্ষৌরকর্ম করা, ইত্যাদির বিধান শাস্ত্রে রয়েছে। এঁরা তা না করে কেন খাওয়া-দাওয়া করছেন ?”
[বঙ্গদেশ থেকে গোড়ীয় বৈষ্ণবগণ পুরীধামে এসে শাস্ত্রনির্দেশানুসারে উপবাস এবং ক্ষৌরকর্ম না করে সরাসরি মহাপ্রভু দত্ত মহাপ্রসাদ গ্রহণ করেন । এতে দ্বিধান্বিত মহারাজ প্রতাপরুদ্র এবং সার্বভৌম ভট্টাচার্যের মধ্যে নিম্নোক্ত শ্লোকগুলি আলোচিত হয়েছিল ।]
চৈঃ চঃ মধ্য ১১.১১২
ভট্ট কহে,—তুমি যেই কহ, সেই বিধি-ধর্ম ।
এই রাগমার্গে আছে সূক্ষ্মধৰ্ম-মৰ্ম ৷৷
ভট্টাচার্য রাজাকে বললেন, “আপনি যা বলছেন সেটি বিধি-ধর্ম, কিন্তু তা ছাড়া আর একটি মার্গ রয়েছে যাকে বলা হয় রাগমার্গ, এবং তাতে ধর্ম অনুশীলনের একটি সূক্ষ্ম মর্ম রয়েছে।”
চৈঃ চঃ মধ্য ১১.১১৩
ঈশ্বরের পরোক্ষ আজ্ঞা – ক্ষৌর, উপোষণ ।
প্রভুর সাক্ষাৎ আজ্ঞা - প্ৰসাদ ভোজন ৷৷
শাস্ত্রের যে মস্তক মুণ্ডন এবং উপবাস ইত্যাদি করার নির্দেশ রয়েছে, সেগুলি ভগবানের পরোক্ষ নির্দেশ । কিন্তু ভগবানের প্রসাদ গ্রহণ করা ছিল মহাপ্রভুর সাক্ষাৎ আদেশ তাই স্বাভাবিকভাবেই ভক্তরা প্রসাদ গ্রহণ করাকেই তাঁদের প্রধান কর্তব্য বলে মনে করেছিলেন।
চৈঃ চঃ মধ্য ১১.১১8
তাহা উপবাস, যাহা নাহি মহাপ্ৰসাদ ।
প্রভু-আজ্ঞা-প্রসাদ-ত্যাগে হয় অপরাধ ৷৷
“যেখানে মহাপ্রসাদ নেই সেখানেই উপবাস করতে হয়, কিন্তু ভগবান নিজে যখন প্রসাদ গ্রহণ করতে বলছেন, তখন সেই প্রসাদ যদি ত্যাগ করা হয় তাহলে অপরাধ হয়। ”
চৈঃ চঃ মধ্য ১১.১১৫
বিশেষে শ্রীহস্তে প্রভু করে পরিবেশন ।
এত লাভ ছাড়ি' কোন্ করে উপোষণ ৷৷
বিশেষ করে শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু যখন নিজের হাতে সেই প্রসাদ পরিবেশন করছেন, তখন সেই পরম সৌভাগ্য ত্যাগ করে কে উপবাস করবে?
চৈঃ চঃ মধ্য ১১.১১৭
যাঁরে কৃপা করি' করেন হৃদয়ে প্রেরণ । কৃষ্ণাশ্রয় হয়, ছাড়ে বেদ-লোক—ধর্ম ৷৷
যাকে কৃপা করে তিনি হৃদয়ে প্রেরণা দেন, তিনিই ঐকান্তিভাবে কৃষ্ণের চরণে আশ্রয় গ্রহণ করেন এবং সবরকম বৈদিক আচার এবং লৌকিক আচার পরিত্যাগ করেন ।
বৈষ্ণব-উচ্ছিষ্ট গ্রহণ
চৈঃ চঃ অন্ত্য ১৬.৫৮
তাতে ‘বৈষ্ণবের ঝুটা’ খাও ছাড়ি' ঘৃণা-লাজ।
যাহা হৈতে পাইবা নিজ বাঞ্ছিত সব কাজ ৷৷
তাই, সমস্ত ঘৃণা এবং লজ্জা পরিত্যাগ করে, বৈষ্ণবের উচ্ছিষ্ট গ্রহণ কর, তাহলে তোমার সমস্ত অভীষ্ট সিদ্ধ হবে। [সাধকদের প্রতি গ্রন্থকর্তা কৃষ্ণদাস কবিরাজ গোস্বামীর নির্দেশ। কালিদাসের বৈষ্ণব উচ্ছিষ্ট গ্রহণ আখ্যান]
মহাপ্রভুর মহাপ্রসাদ মাহাত্ম্য বর্ণন
[একদিন জগন্নাথ মন্দিরে মহাপ্রসাদ গ্রহণকালে নিম্নোক্ত শ্লোকগুলির দ্বারা মহাপ্রভু মহাপ্রসাদের মাহাত্ম্য বর্ণনা করেন]
মহাপ্রসাদ এবং মহা-মহাপ্রসাদ
চৈঃ চঃ অন্ত্য ১৬.৫৯
কৃষ্ণের উচ্ছিষ্ট হয় ‘মহাপ্রসাদ' নাম ৷
‘ভক্তশেষ’ হৈলে 'মহা-মহাপ্রসাদাখ্যান' ৷৷
শ্রীকৃষ্ণের উচ্ছিষ্টকে বলা হয় মহাপ্রসাদ, এবং তা যখন ভক্ত কর্তৃক আস্বাদিত হয় তখন তাকে বলা হয় মহা-মহাপ্রসাদ ।
ব্ৰহ্মাদি-দুর্লভ
চৈঃ চঃ অন্ত্য ১৬.৯৭
প্রভু কহে,—“এই যে দিলা কৃষ্ণাধরামৃত ৷
ব্রহ্মাদি-দুর্লভ এই নিন্দয়ে ‘অমৃত’৷৷”
শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু তাদের বললেন, “তোমরা যে আমাকে শ্রীকৃষ্ণের এই অধরামৃত দিলে তা ব্রহ্মার দুর্লভ এবং তা অমৃতকেও পর্যন্ত নিন্দা করে।”
মহাপ্রসাদ সেবনকারী মহাভাগ্যবান
চৈঃ চঃ অন্ত্য ১৬.৯৮
কৃষ্ণের যে ভুক্ত-শেষ, তার ‘ফেলা’–নাম ৷
তার এক ‘লব’ যে পায়, সেই ভাগ্যবান্ ॥
শ্রীকৃষ্ণের ভুক্তাবশিষ্টকে বলা হয় ‘ফেলা’, এবং তার লব মাত্রও যে পায় সে মহাভাগ্যবান ।
কেবল কৃষ্ণের পূর্ণকৃপা প্রাপ্ত ব্যক্তিই মহাপ্রসাদ প্রাপ্তির যোগ্য
চৈঃ চঃ অন্ত্য ১৬.৯৯
সামান্য ভাগ্য হৈতে তার প্রাপ্তি নাহি হয়।
কৃষ্ণের যাঁতে পূর্ণকৃপা, সেই তাহা পায় ৷
অসাধারণ ভাগ্য না থাকলে তা পাওয়া যায় না । যাঁর প্রতি শ্রীকৃষ্ণ পূর্ণরূপে কৃপা করেন, সেই তা পায় ।
সুকৃতির সংজ্ঞা
চৈঃ চঃ অন্ত্য ১৬.100
‘সুকৃতি’—শব্দে কহে ‘কৃষ্ণকৃপা-হেতু পুণ্য’। সেই যাঁর হয়, ‘ফেলা' পায় সেই ধন্য ৷৷
‘সুকৃতি’ শব্দের অর্থ শ্রীকৃষ্ণের কৃপা-জনিত পুণ্য । সেই সুকৃতি লাভ করে যে ধন্য হয়েছে, সেই কৃষ্ণের ‘ফেলা’ পায় ।
মহাপ্রসাদের অলৌকিক গন্ধ এবং আস্বাদন
চৈঃ চঃ অন্ত্য ১৬.১০
সেই দ্রব্যে এত আস্বাদ, গন্ধ লোকাতীত ৷
আস্বাদ করিয়া দেখ, – সবার প্রতীত ॥
কিন্তু সেই সমস্ত দ্রব্যের এত আস্বাদন, এমন অলৌকিক গন্ধ । তোমরা আস্বাদন করে দেখ, তাহলেই সকলে বুঝতে পারবে ।
মহাপ্রসাদের গন্ধেই জড়-বিষয়-বিস্মৃতি
চৈঃ চঃ অন্ত্য ১৬.
আস্বাদ দূরে রহু, যার গন্ধে মাতে মন ।
আপনা বিনা অন্য মাধুর্য করায় বিস্মরণ ॥
আস্বাদন করা দূরে থাক, যার গন্ধে মন মাতে এবং তার মাধুর্য ব্যতীত অন্য সব কিছুর কথা ভুলিয়ে দেয় ।
কৃষ্ণাধর স্পর্শ
চৈঃ চঃ অন্ত্য ১৬.১
তাতে এই দ্রব্যে কৃষ্ণাধর-স্পর্শ হৈল ।
অধরের গুণ সব ইহাতে সঞ্চারিল ৷
তাই বুঝতে হবে যে শ্রীকৃষ্ণ তাঁর অধরের দ্বারা এই সমস্ত দ্রব্য স্পর্শ করেছেন, এবং তাঁর অধরের সমস্ত গুণ এতে সঞ্চারিত হয়েছে।
ভক্তিবৃক্ষ
ভক্তিবৃক্ষে মহাপ্রভুর পদবী কি?
চৈঃ চঃ আদি ৯.৬
মালাকারঃ স্বয়ং কৃষ্ণপ্রেমামরতরতরুঃ স্বয়ম্।
দাতা ভোক্তা তৎফলানাং যস্তং চৈতন্যমাশ্রয়ে ৷
শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু নিজেই হচ্ছেন কৃষ্ণপ্রেমরূপ অপ্রাকৃত তরু, তার মালাকার এবং সেই বৃক্ষের ফলসমূহের দাতা ও ভোক্তা, সেই শ্ৰীকৃষ্ণচৈতন্য মহাপ্রভুকে আমি আশ্রয় করি ।
বিশ্বম্ভর নামের সার্থকতা
চৈঃ চঃ আদি ৯.৭
প্ৰভু কহে, আমি ‘বিশ্বম্ভর' নাম ধরি ৷
নাম সার্থক হয়, যদি প্রেমে বিশ্ব ভরি ৷৷
শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু ভাবলেন, “আমার নাম বিশ্বম্ভর, অর্থাৎ ‘সমগ্র বিশ্বের পালনকর্তা' । সেই নাম সার্থক হয়, যদি ভগবৎ-প্রেমে আমি সমগ্র বিশ্ব ভরে দিতে পারি ।”
ইচ্ছারূপ বারি সিঞ্চন
চৈঃ চঃ আদি ৯.৯
শ্রীচৈতন্য মালাকার পৃথিবীতে আনি' ।
ভক্তি-কল্পতরু রোপিলা সিঞ্চি'-ইচ্ছা-পানি ৷৷
এভাবেই শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু ভক্তি-কল্পতরু পৃথিবীতে আনয়ন করে তার মালাকার হলেন । তিনি সেই বীজ রোপণ করে তাতে ইচ্ছারূপ বারি সিঞ্চন করলেন ।
তাঁর অচিন্ত্য শক্তির প্রভাব
চৈঃ চঃ আদি ৯.১২
নিজাচিন্ত্যশক্ত্যে মালী হঞা স্কন্ধ হয় ।
সকল শাখার সেই স্কন্ধ মূলাশ্ৰয় ৷৷
তাঁর অচিন্ত্য শক্তির প্রভাবে ভগবান একাধারে সেই বৃক্ষের মালী ও স্কন্ধ। সেই স্কন্ধ হচ্ছে সমস্ত শাখার মূল আশ্ৰয় ।
সর্ব অঙ্গে ফল
চৈঃ চঃ আদি ৯.২৫
উডুম্বর-বৃক্ষ যেন ফলে সর্ব অঙ্গে ।
এই মত ভক্তিবৃক্ষে সৰ্বত্ৰ ফল লাগে ৷৷
একটি বৃহৎ ডুমুর বৃক্ষের সর্ব অঙ্গে যেমন ফল ধরে, তেমনই ভক্তিবৃক্ষের সর্ব অঙ্গেও ফল ধরে।
বিনামূল্যে ফল বিতরণ
চৈঃ চঃ আদি ৯.২৭
পাকিল যে প্রেমফল অমৃত-মধুর।
বিলায় চৈতন্যমালী, নাহি লয় মূল ৷
ফলগুলি পেকে অমৃতের থেকেও মধুর হল । মালাকার শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু কোন মূল্য না নিয়ে সেগুলি বিতরণ করলেন ।
একটি ফলের মূল্য
চৈঃ চঃ আদি ৯.২৮
ত্রিজগতে যত আছে ধন-রত্নমণি।
একফলের মূল্য করি' তাহা নাহি গণি ॥
ত্রিজগতের সমস্ত ধন-রত্ন, মণি-মাণিক্য একত্রিত করলেও তার মূল্য ভক্তিবৃক্ষের একটি অমৃত ফলের সমতুল্য হতে পারে না ।
নির্বিচারে দান
চৈঃ চঃ আদি ৯.২৯
মাগে বা না মাগে কেহ, পাত্র বা অপাত্ৰ ৷
ইহার বিচার নাহি জানে, দেয় মাত্ৰ ৷
কে তা চাইল আর কে চাইল না, কে তা গ্রহণে সমর্থ বা অসমর্থ, সে সমস্ত বিবেচনা না করে শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু ভক্তিবৃক্ষের ফল বিতরণ করলেন ।
একমাত্র মালাকার
চৈঃ চঃ আদি ৯.৩৪
একলা মালাকার আমি কাহা কাহাঁ যাব ৷
একলা বা কত ফল পাড়িয়া বিলাব ৷৷
আমি হচ্ছি একমাত্র মালাকার । একা একা আমি কত জায়গায় যেতে পারি ? কত ফলই বা পেড়ে বিলাতে পারি ?
একা বিতরণের অসুবিধা
চৈঃ চঃ আদি ৯.৩৫
একলা উঠাঞা দিতে হয় পরিশ্রম ।
কেহ পায়, কেহ না পায়, রহে মনে ভ্ৰম ৷৷
একা একা সেই ফলগুলি পেড়ে বিতরণ করা অত্যন্ত শ্রম সাপেক্ষ কাজ । তার ফলে কেউ সেগুলি পায়, কেউ সেগুলি পায় না বলেই আমার মনে হয় ।
মালাকারের আজ্ঞা
চৈঃ চঃ আদি ৯.৩৬
অতএব আমি আজ্ঞা দিলু সবাকারে ।
যাহা তাহা প্রেমফল দেহ' যারে তারে ॥
তাই কৃষ্ণভাবনার অমৃত গ্রহণ করে সর্বত্র তা বিতরণ করার জন্য আমি এই পৃথিবীর প্রতিটি মানুষকে আদেশ দিলাম ।
চৈঃ চঃ আদি ৯.৩৭
একলা মালাকার আমি কত ফল খাব ৷
না দিয়া বা এই ফল আর কি করিব ॥
আমি একলা মালাকার। এই ফল যদি আমি বিতরণ না করি, তা হলে আমি সেগুলি নিয়ে কি করব ? আমি একলা কত ফল খাব ?
রূপশিক্ষায় শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু শ্রীল রূপ গোস্বামীর নিকট ভক্তিলতা-বীজের একটি অনুপম বর্ণনা প্রদান করেন।
গুরু-কৃষ্ণ কৃপায় ভক্তিলতা বীজ লাভ
চৈঃ চঃ মধ্য ১৯.১৫১
ব্রহ্মাণ্ড ভ্রমিতে কোন ভাগ্যবান্ জীব ।
গুরু-কৃষ্ণ-প্রসাদে পায় ভক্তিলতা-বীজ ৷
জীব তার কর্ম অনুসারে ব্রহ্মাণ্ডে ভ্রমণ করে। কখনও সে উচ্চতর লোকে উন্নীত হয় এবং কখনও নিম্নতর লোকে অধঃপতিত হয় । এইভাবে ভ্রমণরত অসংখ্য জীবের মধ্যে কদাচিৎ কোন একটি জীব তার অসীম সৌভাগ্যের ফলে, শ্রীকৃষ্ণের কৃপায়, সদ্গুরুর সান্নিধ্য লাভ করে । এইভাবে, গুরু ও কৃষ্ণ, উভয়ের কৃপার প্রভাবে জীব ভক্তিলতার বীজ প্রাপ্ত হয় ।
বীজ আরোপন এবং জল সেচন
চৈঃ চঃ মধ্য ১৯.১৫
মালী হঞা করে সেই বীজ আরোপণ
শ্রবণ-কীর্তন-জলে করয়ে সেচন ।।
সেই বীজ লাভ করার পর, মালী হয়ে সেই বীজটিকে হৃদয়ে রোপণ করতে হয়, এবং শ্রবণ, কীর্তন রূপ জল তাতে সিঞ্চন করতে হয়।
এমনকি কল্পবৃক্ষে আরোহণের পরও জল সেচন অব্যাহত থাকে
চৈঃ চঃ মধ্য ১৯.১৫৩-১৫৫
উপজিয়া বাড়ে লতা ‘ব্ৰহ্মাণ্ড’ ভেদি যায় ৷
‘বিরজা’, ‘ব্রহ্মলোক’ ভেদি' ‘পরব্যোম’ পায় ৷৷
তবে যায় তদুপরি ‘গোলক-বৃন্দাবন' ।
‘কৃষ্ণচরণ’-কল্পবৃক্ষে করে আরোহণ ৷৷
তাহা বিস্তারিত হঞা ফলে প্রেম-ফল।
ইহা মালী সেচে নিত্য শ্রবণাদি জল ৷
ভক্তিলতার বীজটিতে জল সেচন করার ফলে বীজটি অঙ্কুরিত হয়, এবং ভক্তিলতা ধীরে ধীরে বাড়তে বাড়তে ব্রহ্মাণ্ডের আবরণ ভেদ করে, জড়-জগৎ এবং চিৎ-জগতের মধ্যবর্তী বিরজা নদী অতিক্রম করে, ব্রহ্মলোক বা ব্রহ্মজ্যোতি ভেদ করে পরব্যোম বা চিৎ-জগতে গিয়ে পৌঁছায় । তারপর তা তারও উপরে গোলক বৃন্দাবনে গিয়ে পৌঁছায়, এবং সেখানে শ্রীকৃষ্ণের চরণ রূপ কল্পবৃক্ষে আরোহণ করে । গোলক বৃন্দাবনে সেই ভক্তিলতা আরও বিস্তারিত হয়ে কৃষ্ণপ্রেমরূপ ফল প্রদান করেন, আর এখানে, মালী সেই লতাটির গোড়ায় নিত্য শ্রবণ-কীৰ্তন আদি জল সিঞ্চন করেন ।
মত্ত হস্তী থেকে সাবধান
চৈঃ চঃ মধ্য ১৯.১৫৬ ১৫৭
যদি বৈষ্ণব-অপরাধ উঠে হাতী মাতা ।
উপাড়ে বা ছিণ্ডে, তার শুখি’ যায় পাতা ৷৷
তাতে মালী যত্ন করি' করে আবরণ।
অপরাধ হস্তীর যৈছে না হয় উদ্গম ৷৷
ভগবদ্ভক্ত যদি এই জড় জগতে ভক্তিলতার সেবা করার সময় কোন বৈষ্ণবের চরণে অপরাধ করেন, তাহলে ভক্তিলতার পাতা শুকিয়ে যায় । এই প্রকার বৈষ্ণব-অপরাধকে মত্ত হস্তীর আচরণের সঙ্গে তুলনা করা হয়েছে । অপরাধ রূপ হস্তী যাতে প্রবেশ করতে না পারে, তাই মালী যত্ন করে ভক্তিলতার চারিদিকে বেড়া দিয়ে দেন ।
উপশাখা
চৈঃ চঃ মধ্য ১৯.১৫৮ ১৫৯
কিন্তু যদি লতার অঙ্গে উঠে ‘উপশাখা’।
ভুক্তি-মুক্তি-বাঞ্ছা, যত অসংখ্য তার লেখা ॥
‘নিষিদ্ধাচার’, ‘কুটীনাটী’, ‘জীবহিংসন’।
‘লাভ’, ‘পূজা’, ‘প্রতিষ্ঠাদি' যত উপশাখাগণ ৷৷
ভুক্তি, মুক্তি, সিদ্ধি-বাসনা, নিষিদ্ধাচার, কুটীনাটী, জীবহিংসা, লাভ, পূজা, প্রতিষ্ঠা ইত্যাদি ভক্তিলতার অঙ্গে উপশাখার মতো ।
উপশাখা বৃদ্ধির পরিণতি
চৈঃ চঃ মধ্য ১৯.১৬০
সেকজল পাঞা উপশাখা বাড়ি' যায় ৷
স্তব্ধ হঞা মূল শাখা বাড়িতে না পায় ৷৷
জল পেয়ে উপশাখাগুলি বাড়তে থাকে, এবং তার ফলে ভক্তিলতা বাড়তে পারে না ।
উপশাখা ছেদন
চৈঃ চঃ মধ্য ১৯.১
প্রথমেই উপশাখার করয়ে ছেদন ।
তবে মূলশাখা বাড়ি' যায় বৃন্দাবন ৷৷
বুদ্ধিমান ভক্ত প্রথমেই উপশাখাগুলি ছেদন করেন, তাহলে মূলশাখা বর্ধিত হয়ে বৃন্দাবনে কৃষ্ণরূপ কল্পবৃক্ষের আশ্রয় অবলম্বন করে।
কোন মন্তব্য নেই