আমি অতি দীনমতি, ব্রজকুঞ্জে নিবসতি
আমি
অতি দীনমতি, ব্রজকুঞ্জে নিবসতি,
রাধাকৃষ্ণ যুগল-চরণে।
কাঁদিয়া কাঁদিয়া আজ, ছাড়ি সব
লোকলাজ,
নিবেদিব যত আছে মনে॥১॥
তুমি কৃষ্ণ
নীলমণি, নব
মেঘপ্রভা জিনি,
এ ব্ৰজানন্দ কর বিতরণ।
তুমি রাধে নবগৌরী, গোরোচনা-গর্ব
হরি’
এ ব্ৰজে হর কৃষ্ণচন্দ্র মন॥২॥
তুমি কৃষ্ণ
পীতাম্বরে, পরাজিয়া
আর্তস্বরে,
ব্রজবনে নিত্য কেলিরত।
তুমি রাধে নীলাম্বরী, পলাশের
গর্ব হরি’
কৃষ্ণকেলিসহায় সতত॥৩॥
তুমি কৃষ্ণ
হরিন্মণি, যুবাবৃন্দ-শিরোমণি,
রাধিকা তোমার প্রাণেশ্বরী।
ব্রজাঙ্গনা শিরঃশোভা, ধম্মিল-মল্লিকা-প্রভা,
তুমি রাধে কৃষ্ণপ্রিয়ঙ্করী॥৪॥
রমাপতি-শোভা জিনি, কৃষ্ণ তব
রূপখানি,
জগৎ মাতায় ব্রজবনে ।
রমা-জিনি ব্রজাঙ্গনা এক গণমধ্যে সুশোভনা,
তুমি রাধে কৃষ্ণচিত্তাঙ্গনে॥৫॥
বাঙ্গ
সৌরভকণ, বংশীগীত
অনুক্ষণ,
ওহে কৃষ্ণ! রাধামন হরে।
রাধে! অঙ্গগন্ধ তব, তোমার
সুবীণারব,
কৃষ্ণচিত্ত উন্মাদিত করে॥৬॥
তোমার চপলেক্ষণ, হরে
রাধা-ধৈৰ্য্যধন,
তুমি কৃষ্ণ চৌরশিরোমণি।
বাঁকা দৃষ্টিভঙ্গীতব, শ্রীকৃষ্ণ-হৃদয়াসব,
তুমি রাধে কলাবতী ধনী॥৭॥
পরিহাসে
রাধিকার, কথা
নাহি সরে যার,
কি তুমি কৃষ্ণ নটকুলগুরু।
কৃষ্ণ-নর্ম-উক্তি শুনি’ রোমাঞ্চিত তনুখানি,
তব রাধে রসকল্পতরু॥৮॥
অপ্রাকৃত
গুণমণি, বিনির্মিত-গিরিশ্রেণী,
তুমি কৃষ্ণ সর্বগুণময়।
উমাদি রমণীজন, বাঞ্ছনীয়
গুণগণ,
রাধে তব স্বাভাবিক হয়॥৯॥
আমি অতি
মন্দমতি, করিহে
কাকুতি নতি,
নিষ্কপটে এ প্রার্থনা করি।
বৃন্দাবন-অধীশ্বর, তুমি
কৃষ্ণ প্রাণেশ্বর,
তুমি রাধে ব্রজবনেশ্বরী॥১০॥
তোমাদের
কৃপা পাই, এরূপ যোগ্যতা নাই,
যদিও আমার ব্রজবনে।
দুহে মহাকৃপাময়, জানি’
কৈনু পদাশ্রয়,
কৃপা কর, এ
অধম জনে॥১১॥
কেবল অযোগ্য
নহি, অপরাধী
আমি হই,
তথাপি করহ কৃপা দান।
লোকে কৃপাবিষ্ট জন, ক্ষমে
অপরাধগণ,
তুমি দুহে মহা কৃপাবান্॥১২॥
কৃপাহেতু
ভক্তিসার, লেশাভাস
নাহি তার,
কৃপা-অধিকারী নহি আমি।
পুঁহে মহালীলেশ্বর, হা
সেই লীলাপর,
কৃপা কর ব্রজজন-স্বামি॥১৩॥
সুদুষ্ট
অভক্ত জনে, শিবাদি
দেবতাগণে,
প্রসন্ন হইল কৃপা করি।
মহালীল সবেশ্বর, দুঁহু মম প্রাণেশ্বর,
দয়া কর দোষ পরিহরি’॥১৪॥
অধমে উত্তম
মানি, মূঢ়, বিজ্ঞ, অভিমানী,
দুষ্ট হঞা শিষ্ট-অভিমান।
এই দোষে দোষী হা, গেল
চিরদিন বঞা,
না করিনু ভজন বিধান॥১৫॥
তথাপি এ দীন
জনে, যদি
নাম-উচ্চারণে,
নামাভাস করিল জীবনে।
সর্বেদোষ নিবারণ দুঁহু নাম-সংজল্পন,
প্রসাদে প্রসীদ দুই জনে॥১৬॥
ভক্তি-লবমাত্রে
ক্ষয় ,সর্ব অপরাধ
হয়,
ক্ষমাশীল দুহের কৃপায়।
এই আশা মনে ধরি, চরণে
প্রার্থনা করি,
শোধ দোষ ক্ষমিয়া আমায়॥১৭॥
সাধন-সম্পত্তিহীন, ওহে এই জীব
দীন,
অতিকষ্টে ধৃষ্টতার ছার।
দুঁহু পাদ-নিপতিত, প্রার্থনা
করয়ে হিত,
প্রসন্নতা হউক দোঁহার॥১৮॥
দন্তে তৃণ
ধরি’ হায়, কাঁদিতেছে
উভরায়,
এই পাপী কম্পিত-শরীর।
হা নাথ হা নাথ বলি’, হয়ে
আজ কৃতাঞ্জলি,
প্রসাদ অর্পিয়া কর স্থির॥১৯॥
এ দুর্ভাগা
হা হা স্বরে, প্রসাদ
প্রার্থনা করে,
অনুতাপে গড়াগড়ি যায়।
হে রাধে! হে কৃষ্ণচন্দ্র! শুন মম কাকুবাদ,
কুঁহু কৃপা বিনা প্রাণ যায়॥২০॥
ফুৎকার
করিয়া কাঁদে, আহা আহা
কাকুনাদে,
বলে, হও
প্রসন্ন আমায়।
এই ত’ অযোগ্য জনে, কৃপা কর
নিজ-গুণে,
করুণাসাগর রাখ পায়॥২১॥
মুখেতে
অঙ্গুষ্ঠ দিয়া, উচ্চৈঃস্বরে
আর্ত হঞা,
কাঁদিতে দিতে বলে,
নাথ।
করুণাকণিকা দানে, রক্ষা কর
মোর প্রাণে,
কর এই দীনে আত্মসাথ॥২২॥
এই তব মূঢ়
জন দীনবাক্যে সক্রন্দন,
প্রার্থনা করয়ে দৃঢ় মনে।
হে করুণা-সুনিধান, অনুগতি
কর দান,
করুণোর্মিচ্ছটা ব্রজবনে॥২৩॥
ভাব
চিত্তসুখকর, যত
আছে সুমধুর,
প্রকটাপ্রকট-লীলাস্থলে।
রাধাকৃষ্ণপ্রেমসার, সকলের
সারাৎসার,
সেই ভাব যেই কৃপাবলে॥২৪॥
যদি এ দাসীর
প্রতি, প্রসন্ন
করুণামতি,
উঁহু পদসেবা কর দান।
আর কিছু নাহি চাই, যুগল-চরণ-পাই,
শীতল হউক মোর প্রাণ॥২৫॥
অনাথ-বৎসল
তুমি, অধম
অনাথ আমি,
ও তদীয় সাক্ষাৎ দাস্য মাগি।
এ প্রসাদ কর দান, রাখ
অনাথের প্রাণ,
ছাড়ি’ সব তব দাস্য মাগি॥২৬॥
শিরেতে
অঞ্জলি ধরি’, ও পদে
বিজ্ঞপ্তি করি,
আমার অভীষ্ট নিবেদন।
একবার দাস্য দিয়া, শীতল
কর হে হিয়া,
তবে মানি সার্থক জীবন॥২৭॥
কবে দুহে এই
বনে, বিলোকিব
সম্মিলনে,
অমূল্যাঙ্গ-পরিমল-ঘ্রাণ।
আমার নাসিকাদ্বারে, প্রবেশিয়া
চিত্তপুরে,
অচৈতন্য করিবে বিধান॥২৮॥
দুহার
নূপুর-ধ্বনি, হংস-কণ্ঠস্বর
জিনি,
মধুর মধুর মম কাণে।
প্রবেশিয়া কোন ক্ষণে, মম
চিত্ত-সুরঞ্জনে,
মাতাইবে সেবারস পানে॥২৯॥
চক্রাদি
সৌভাগ্যাস্পদ, বিলক্ষিত
দুঁহু পদ,
চিহ্ন এই বৃন্দাবন বনে।
দেখিয়া এ দাসী কবে, ভাবিবে
আনন্দোৎসবে,
দুঁহু কৃপা পেয়ে সংযোপনে॥৩০॥
সকল
সৌন্দর্যাস্পদ, নীরাজিত
উঁহু পদ,
হে রাধে! হে নন্দের নন্দন!
মমাক্ষি-গোচরে কবে, সর্বাদ্ভূত
মহোৎসবে,
করিবে আনন্দ বিতরণ॥৩১॥
প্রাচীনাশা, ফলপূর্তি, দুঁহু
পদাম্বুজ-স্ফুর্তি,
সেই উঁহুজন-দরশন।
এ জন্মে কি হবে মম, এ
উৎকণ্ঠা সুবিষম,
বিচলিত করে মম মন॥৩২॥
কবে আমি
বৃন্দাবন- কুঞ্জান্তরে দরশন,
করিব সুন্দর দুহু জনে।
সুরত-লীলায় রত, আমা
হইতে অদূরত,
প্রেমে মগ্ন হ’ব দরশনে॥৩৩॥
ঘটনাবশতঃ
কবে, দুঁহু
যোগ অসম্ভবে,
পরস্পর সন্দেশ আনিয়া।
বাড়াইব দুহু সুখ, যাবে
তবে মনোদুঃখ,
বেড়াইব আনন্দে মাতিয়া॥৩৪॥
কবে এই
বৃন্দাবনে, দুঁহু
উঁহা অদর্শনে,
ফিরে যাব দুহে অন্বেষিয়া
সম্মিলন করাইব, হার-পদকাদি
পাব,
পরিতুষ্ট দুহারে করিয়া॥৩৫॥
দুহে হার
ধরি’ পণে, ন্যূতক্রীড়া-সমাপনে,
আমি জয়ী আমি জয়ী বলি'।
করিবে কলহ তবে, হার-সংগ্রহেতে
কবে,
আমি তাহা দেখিব সকলি॥৩৬॥
আহা কবে দুই
জনে, কুঞ্জমাঝে
সুশয়নে,
কুসুম-শয্যায় ব্রিামিবে।
সে সময়ে উঁহুপদ- সম্বাহন সুসম্পদ,
এ দাসীর সৌভাগ্য মিলিবে॥৩৭॥
কন্দর্প
কলহোদ্গারে, ছিঁড়িবে
কণ্ঠের হারে,
লতা গৃহে পড়িবে খসিয়া।
সে হার গাঁথিতে কবে, এ
দাসী নিযুক্ত হবে,
দুঁহুকৃপা-আজ্ঞা শিরে পাঞা॥৩৮॥
কেলিকল্লোলের
জবে, দুঁহু-কেশ
স্রস্ত হবে,
এ দুজনার ইঙ্গিত পাইয়া।
শিখিপি করে ধরি’, কুন্তল
মণ্ডিত করি’,
আমি রব আনন্দে ডুবিয়া॥৩৯॥
কন্দর্প-ক্রীড়ায়
যবে, দুঁহু
স্র স্রস্ত হবে,
তবে আমি দুঁহু আজ্ঞা পাঞা।
উভয় ললাট মাঝে, করিব
তিলক-সাজে,
মত্ত হ’ব সে শোভা দেখিয়া॥৪০॥
কৃষ্ণ! তব
বক্ষে আমি, বনমালা দিয়া
স্বামি!
রাধে, তব
নয়নে কজ্জল।
কুঞ্জমাঝে কোন দিন, পাব
সুখ সমীচীন,
ম প্রেমে চিত্ত হবে টলমল॥৪১॥
কবে জাম্বুনদ-বর্ণ, লইয়া
তাম্বুলীপর্ণ,
শিরাশূন্য কপূরাদি-চুত।
বীটিকা নির্মাণ করি, পুঁহু
মুখে দিব ধরি,
প্রেমে চিত্ত হবে পরিপ্লুত॥৪২॥
কোথা এ
দুরাশা মোর, কোথা এ
দুষ্কর্ম ঘোর,
এ প্রার্থনা যদি বল কেন।
হে রাধে! হে ঘনশ্যাম! উঁহুজন-গুণগ্রাম
মাধুরী বলায় মোরে হেন॥৪৩॥
দুঁহার যে
কৃপাগুণে পাইনু ধাম বৃন্দাবনে,
সেই কৃপা অভীষ্ট-পূরণ ।
করুন আমায় নাথ! পাঞা উঁহু সখী-সাথ
কুঞ্জসেবা পাই অনুক্ষণ॥৪৪॥
ওহে রাধে!
ওহে কৃষ্ণ! সেই ব্রজরসতৃষ্ণ,
কার্পণ্য-পঞ্জিকা কথা-ছলে।
জল্পনা করয়ে সদা, তার
বাঞ্ছা পূর্তি তদা,
করুন দুহু কৃপা বলে॥৪৫॥
শ্রীরূপ-মঞ্জরীপদ, শিরে ধরি’
সুসম্পদ,
কমল মঞ্জরী করে আশা।
শ্ৰীগোদ্রুম-ব্ৰজবনে, উঁহুলীলা-সন্দর্শনে,
পূর্ণ হউ রসের পিপাসা॥৪৬॥

কোন মন্তব্য নেই